বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে চীন, ভারত ও পাকিস্তান কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়?

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দক্ষিণ এশিয়ার তিন পরাশক্তি চীন, ভারত ও পাকিস্তান ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। ভারত মূলত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং ভারতবিরোধী শক্তির উত্থান নিয়ে চিন্তিত। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার পরিবর্তনকে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং জামায়াত বা বিএনপির জয়ে তাদের কৌশলগত সুবিধা দেখছে। আর চীন সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ও বাস্তববাদী অবস্থানে থেকে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন, আর এই নির্বাচন শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন “আসলে বিদেশিরা কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়?” আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার ও আরটিভি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই পটপরিবর্তনে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

ভারতের অবস্থান: উদ্বেগ নাকি সমঝোতা?

দীর্ঘদিন ধরে ভারত শেখ হাসিনা সরকারকে তাদের কৌশলগত মিত্র হিসেবে মনে করত। সীমান্ত নিরাপত্তা, ট্রানজিট এবং জঙ্গি দমনে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে।

  • ভারতের মূল ভয়: নয়াদিল্লির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো বাংলাদেশে যদি এমন কোনো সরকার আসে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয় বা ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য উত্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় শঙ্কার কারণ হতে পারে।
  • কৌশলগত চাওয়া: ভারত এখন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে। তারা চায়, ক্ষমতায় বিএনপি বা অন্য যে দলই আসুক, তাদের সাথে যেন সংলাপ ও সহযোগিতার পথ খোলা থাকে। ভারতবিরোধীতা যেন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত না হয়, এটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

পাকিস্তানের কৌশল: নতুন সুযোগের সন্ধান

গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পাকিস্তান তাদের জন্য একটি “গোল্ডেন অপরচুনিটি” বা সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে ঢাকার সাথে উষ্ণতা বাড়াতে তারা তৎপর।

  • সম্পর্ক উন্নয়ন: সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ সরাসরি বিমান চলাচল এবং বাণিজ্যের দুয়ার খোলার উদ্যোগ দেখা গেছে। পাকিস্তান চায় বাংলাদেশের সাথে তাদের পুরনো তিক্ততা ভুলে নতুন করে মিত্রতা গড়তে।
  • কাকে চায় পাকিস্তান? বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে ইসলামাবাদ সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও পাকিস্তানের কোনো আপত্তি নেই। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ঢাকা যেন পুরোপুরি ভারতের অক্ষে (Orbit) না থাকে।

চীনের অবস্থান: ব্যবসা ও বাস্তবতা

এই তিন দেশের মধ্যে চীন সবচেয়ে ধূর্ত ও বাস্তববাদী (Pragmatic) অবস্থানে রয়েছে। বেইজিংয়ের কাছে কে ক্ষমতায় এল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আছে কিনা।

  • বিনিয়োগ সুরক্ষা: গত ১০ বছরে চীন বাংলাদেশে প্রচুর অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। চীন চায় তাদের এই বিনিয়োগ নিরাপদ থাকুক।
  • সবার সাথে বন্ধুত্ব: চীন বিএনপি এবং জামায়াত—উভয় দলের সাথেই যোগাযোগ বজায় রাখছে। তাদের নীতি হলো, “যে সরকারই আসুক, সম্পর্ক অটুট থাকবে।”
  • আমেরিকার ফ্যাক্টর: চীনের একমাত্র মাথাব্যথা হলো নতুন সরকার যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে।

আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

ভিডিওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের আগামী সরকারের জন্য পররাষ্ট্রনীতি সামলানো হবে “আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার” মতো। কারণ:

  1. ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ মেটাতে হবে।
  2. পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে কিন্তু ভারসাম্য রেখে।
  3. চীনের বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে।
  4. একই সাথে পাশ্চাত্য শক্তির (USA) চাপ সামলাতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

পাঠকদের মনে এই বিষয় নিয়ে যেসব প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি উঁকি দেয়, তার উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

১. ভারত কি বিএনপিকে ক্ষমতায় মেনে নেবে?

উত্তর: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। ভারত জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছাকে সম্মান জানাবে। যদি বিএনপি ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করার নিশ্চয়তা দেয়, তবে ভারত তাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী।

২. চীন কেন বাংলাদেশের নির্বাচনে এত গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক পার্টনার। তিস্তা প্রকল্প থেকে শুরু করে কর্ণফুলী টানেল সবখানেই চীনের উপস্থিতি। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক, অর্থনৈতিক কারণে চীনের সাথে সুসম্পর্ক রাখা তাদের বাধ্যবাধকতা।

৩. জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে কী হবে?

উত্তর: পাকিস্তান ও চীন হয়তো বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেবে, কিন্তু ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জটিল হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করে দেবে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকবে। চীন, ভারত ও পাকিস্তান সবাই নিজেদের স্বার্থের চশমা দিয়েই বাংলাদেশকে দেখছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে, সেটাই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

তথ্যসূত্র (Sources): Al Jazeera Explainer on South Asian Politics.

Leave a Comment