মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান বাংলাদেশের রাজনীতির এক আলোচিত নাম। হঠাৎ করেই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বা অন্যান্য রাজনৈতিক বলয় ছেড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু কেন? দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষে কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
এই আর্টিকেলে আমরা মেজর আক্তারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদানের মূল কারণ, বিএনপির সাথে তার দ্বন্দ্ব এবং ১৯৭১ সাল নিয়ে তার বর্তমান ব্যাখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।
কেন এই দলবদল?
ভিডিওটিতে মেজর আক্তারুজ্জামান তার সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের মূল সারাংশ হলো:
- বিএনপির অবমূল্যায়ন: দল থেকে বারবার (৫ বার) বহিষ্কার হওয়া এবং সঠিক পরামর্শের গুরুত্ব না দেওয়া।
- রাজনৈতিক বা ভোট ব্যাংকের সংকট: নিজের এবং অনুসারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য একটি দলের প্রয়োজন অনুভব করা।
- জামায়াত সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি: তিনি মনে করেন বর্তমান জামায়াতে ইসলামী এবং ১৯৭১ সালের জামায়াত এক নয়; বর্তমান দলটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং তারা মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে।
- সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতা: তার মতে, জামায়াতের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘রাজনৈতিক’ এবং সত্য প্রকাশ করা তার নৈতিক দায়িত্ব।
বিএনপির সাথে দীর্ঘ সম্পর্কের তিক্ত সমাপ্তি
মেজর আক্তারুজ্জামান ভিডিওতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিএনপির দুঃসময়ে বা বিভিন্ন ক্রাইসিস মোমেন্টে (যেমন—১৯৯১ সাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু) সঠিক পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দল তার পরামর্শ গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেন, “আমি দল থেকে পাঁচবার বহিষ্কার হয়েছি… সংসদীয় রাজনীতি থেকেও আমাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
গত আড়াই বছর ধরে দল থেকে বহিষ্কৃত থাকা অবস্থায় তিনি নিজেকে ‘আত্মপরিচয়হীন’ মনে করছিলেন। তার ভাষায়, তাকে এবং তার হাজার হাজার অনুসারীকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
জামায়াত নিয়ে মেজর আক্তারুজ্জামানের নতুন ব্যাখ্যা
সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আলোচনার বিষয় হলো জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে তার বর্তমান অবস্থান। ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে যে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ রাজনীতি করছে, তা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের সাথে যুক্ত নয়।
তার যুক্তিসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
- দলের জন্মকাল: তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ১৯৭৯-৮০ সালে (মে ১৯৮০), তাই এটি একাত্তরের পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী নয়।
- মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি: তার মতে, দলটির গঠনতন্ত্রে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে যে তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে।
- একাত্তরের দায়ভার: তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে পাকিস্তানিরা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল এককভাবে নয়। তার মতে, বর্তমানে জামায়াতের ওপর যে ‘লাখো মানুষ হত্যার’ দায় চাপানো হয়, তা সঠিক নয় এবং এটি একটি রাজনৈতিক অপবাদ।
উদ্ধৃতি: “জামায়াত তো যুদ্ধাপরাধী দল নয়… আল্লাহ আমার কাছে সত্যকে আমানত হিসেবে রেখেছেন, তা প্রকাশ করা আমার দায়িত্ব।” — মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান।
হঠাৎ কেন জামায়াতের প্রতি সহানুভূতি?
মেজর আক্তারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর বিএনপি জামায়াতকে সাথে নিয়ে আন্দোলন ও সরকার গঠন করার পর, এখন কেন হঠাৎ করে তাদের বিরুদ্ধে ‘লাখো মানুষ হত্যার’ অভিযোগ তুলছে? তিনি মনে করেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যের স্বার্থে এখন বিভেদ তৈরি করা উচিত নয়।
তিনি জানান, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাথে আলোচনার পর তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পাঠকদের সাধারণ প্রশ্ন
১. মেজর আক্তারুজ্জামান কবে জামায়াতে যোগ দেন?
ভিডিওর তথ্যানুসারে, তিনি সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের আমিরের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের ঘোষণা দেন।
২. তিনি কি বিএনপির সদস্য ছিলেন?
হ্যাঁ, তিনি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এবং দলটিতে দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেছেন, তবে একাধিকবার বহিষ্কৃতও হয়েছেন।
৩. ১৯৭১ সাল নিয়ে তার মন্তব্য কী?
তিনি মনে করেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল দায় পাকিস্তানি বাহিনীর। বর্তমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঢালাওভাবে যুদ্ধাপরাধী বলাকে তিনি ‘রাজনৈতিক রেটোরিক’ বা মিথ্যাচার বলে মনে করেন।
শেষ কথা
মেজর আক্তারুজ্জামানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে। তার এই ব্যাখ্যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, আবার অনেকের কাছে বিতর্কিতও মনে হতে পারে। তবে তার মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক পরিচয় ফিরে পাওয়া এবং তার দৃষ্টিতে ‘সত্য’ প্রতিষ্ঠা করা।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।