আপনি কি জানতে চাইছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান কীভাবে এতটা শক্ত প্রতিরোধ গড়ছে? এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো হ্যাঁ, ইরানকে পেছন থেকে কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে চীন ও রাশিয়া। মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর নির্ভুল গতিবিধি জানতে রাশিয়া তাদের অত্যাধুনিক ওভারহেড স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, চীন ইরানকে মিসাইল তৈরির প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান এবং মার্কিন জিপিএস-এর বিকল্প হিসেবে তাদের নিজস্ব ‘বাইডো’ (Beidou) নেভিগেশন সিস্টেম দিয়ে সহায়তা করছে। এর বিনিময়ে দেশ দুটি ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল ও ড্রোন সহায়তা পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বর্তমান সরকার উৎখাত এবং তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও, এটি বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। কারণ ইরানের বেশিরভাগ সংবেদনশীল স্থাপনা মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত।
তবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চমক হলো পর্দার আড়ালে থাকা বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর খেলা। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নিই, এই যুদ্ধে চীন ও রাশিয়া কীভাবে তেহরানের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ার গোপন গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক চুক্তি
রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এখন আর কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং তা গভীর সামরিক চুক্তিতে রূপ নিয়েছে।
- স্যাটেলাইট ইন্টেলিজেন্স: সিএনএন-এর তথ্যমতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা ও বিমানবাহী রণতরীর গতিবিধির পুঙ্খানুপুঙ্খ গোয়েন্দা তথ্য ইরানকে দিচ্ছে রাশিয়া। মস্কো এক্ষেত্রে তাদের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
- ২০ বছরের কৌশলগত চুক্তি: ২০২৫ সালের শুরুতেই রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
- পারস্পরিক স্বার্থ: এই সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরানের কাছ থেকে ‘শাহেদ ১৩৬’ (Shahed-136) মডেলের আত্মঘাতী ড্রোন পেয়েছে।
চীনের ‘বাইডো’ (Beidou) নেভিগেশন ও মিসাইল সহায়তা
চলমান যুদ্ধে চীন প্রকাশ্যে শান্তির কথা বললেও, পর্দার আড়াল থেকে তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে।
- মার্কিন জিপিএস-এর বিকল্প ‘বাইডো’: ফরাসি সমরবিদ এলাইন জুলিয়েট এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার মতে, যুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকা যেকোনো সময় তাদের জিপিএস (GPS) সুবিধা বন্ধ করে দিতে পারে। এই আশঙ্কায় ইরান এখন চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ‘বাইডো’ (Beidou) ব্যবহার করে ইসরায়েলি ও মার্কিন ঘাঁটিতে নির্ভুল মিসাইল হামলা চালাচ্ছে।
- মিসাইল তৈরির কাঁচামাল: দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর ৯ মার্চ, ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব চীনের গাওলান বন্দর থেকে রাসায়নিক পদার্থবাহী দুটি জাহাজ ইরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে, যা মিসাইল তৈরির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
- জ্বালানি চুক্তি: ২০২১ সালে চীনের সাথে ইরানের ২৫ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত চুক্তি হয়। বর্তমানে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি তেলের ক্রেতা হলো চীন।
ইরানের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী?
বাইরের সহায়তা ছাড়াও ইরানের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতি বেশ চমকপ্রদ:
- পুরনো অস্ত্রের ব্যবহার: ইরানের আইআরজিসি (IRGC) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়েমী জানিয়েছেন, তারা এখনও শত্রুদের বিরুদ্ধে বহু পুরনো মিসাইল ব্যবহার করছেন। নিজেদের তৈরি সবচেয়ে আধুনিক মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোনগুলো তারা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রেখেছেন।
- দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি: তেহরান নিজেদের মিসাইল উৎপাদন এতটা বাড়িয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে টানা আরও ৬ মাস পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
বাংলাদেশিদের ওপর এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব কী?
মধ্যপ্রাচ্যের এই পরাশক্তির লড়াই শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতেও পড়ছে:
- রেমিট্যান্স ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি: মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০-৫০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। সংঘাত বড় আকার ধারণ করলে এই কর্মীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
- জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: ইরান বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়বে, যার ফলে বাংলাদেশে পরিবহন খরচ ও জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: চীন ও রাশিয়া কি সরাসরি ইরানের হয়ে যুদ্ধ করছে?
উত্তর: না, চীন বা রাশিয়া সরাসরি সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। তবে তারা পর্দার আড়াল থেকে গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে তেহরানকে শক্তিশালী করছে।
প্রশ্ন ২: চীনের ‘বাইডো’ (Beidou) সিস্টেম কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ‘বাইডো’ হলো চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম, যা মার্কিন জিপিএস-এর (GPS) সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। আমেরিকা জিপিএস বন্ধ করে দিলে ইরানের মিসাইলগুলো যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়, সেজন্য তেহরান এই সিস্টেম ব্যবহার করে নিখুঁত হামলা পরিচালনা করছে।
প্রশ্ন ৩: যুক্তরাষ্ট্র কি চাইলেই ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করতে পারে?
উত্তর: এটি অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কারণ ইরানের বেশিরভাগ পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা মাটির এত গভীরে সুরক্ষিত যে, সাধারণ বোমা হামলা চালিয়ে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন সমর বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন ৪: ইরান-চীন ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি কী?
উত্তর: ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় চীন ইরানের জ্বালানি খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং বিনিময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল পাবে। এই অর্থনৈতিক সুরক্ষাই ইরানকে পশ্চিমা অবরোধের মুখেও টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
প্রিয় পাঠক, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো জটিল বিষয়গুলো সহজে বোঝার জন্য আমাদের অন্যান্য এক্সপ্লেইনার আর্টিকেলগুলো পড়তে পারেন। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।