রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তবে অনেক সময় না জানার কারণে বা ভুলবশত এমন কিছু কাজ হয়ে যায়, যার ফলে রোজা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আপনি যদি খুঁজছেন রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি কী কী এবং কোন কাজগুলো করলে রোজা ভেঙে যায়, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্যই। চলুন, কোরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত জেনে নিই।

সাধারণত ইচ্ছাকৃত পানাহার করা, স্ত্রী সহবাস করা এবং ধূমপান করার মাধ্যমে রোজা ভেঙে যায়। এর বাইরেও ওষুধ বা ড্রপ গলায় পৌঁছানো, ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করা, কুলি করার সময় ভুলবশত পানি গিলে ফেলাসহ ফিকহ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ১৯টি কারণে রোজা ভঙ্গ হয়। এর মধ্যে কিছু কারণে শুধু রোজার ‘কাজা’ ওয়াজিব হয়, আবার কিছু কারণে কাজা ও ‘কাফফারা’ উভয়ই আদায় করতে হয়।

🛑 রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি

ইসলামী শরীয়ত ও হানাফী ফিকহ (ফতোয়ায়ে শামী ও আলমগীরী) অনুযায়ী নিচে উল্লেখিত ১৯টি কারণে রোজা ভেঙে যায়:

পানাহার ও গ্রহণ সংক্রান্ত কারণ:

১. ইচ্ছাকৃত পানাহার: রোজা স্মরণ থাকা অবস্থায় জেনেশুনে যেকোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা। (এতে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব)।

২. অস্বাভাবিক বস্তু গিলে ফেলা: এমন বস্তু খাওয়া যা সাধারণত খাবার নয় (যেমন: পাথর, মাটি, কয়লা, কাগজ, কাঠ বা লোহা)।

৩. ধূমপান করা: বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা বা ভেপ সেবন করা। ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গলায় প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যায়।

৪. নিজের থুতু হাতে নিয়ে গেলা: মুখের থুতু স্বাভাবিকভাবে গিলে ফেললে রোজা ভাঙে না, তবে থুতু হাতে বা বাইরে নিয়ে পুনরায় মুখে দিয়ে গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে।

৫. বৃষ্টি বা বরফ গিলে ফেলা: বৃষ্টির পানি বা বরফের টুকরো মুখে পড়ার পর তা গলার ভেতরে চলে যাওয়া।

৬. কাঁচা চাল বা আটার খামির খাওয়া: এগুলো স্বাভাবিক খাবার না হলেও গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যায়।

৭. মুখে খাবার রেখে ঘুমানো: মুখে পান, সুপারি বা অন্য কোনো খাবার রেখে ঘুমিয়ে পড়া এবং এই অবস্থায় সুবহে সাদিক (ফজরের সময়) পার হয়ে যাওয়া।

ভুল ধারণা ও সময় সংক্রান্ত কারণ:

৮. ভুল সময়ে সেহরি খাওয়া: রাত আছে মনে করে সেহরি খেতে থাকা, কিন্তু পরে জানা গেল যে সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত) আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

৯. ভুল সময়ে ইফতার করা: সূর্যাস্ত হয়ে গেছে বা আজান দিয়ে দিয়েছে ভেবে ইফতার করে ফেলা, কিন্তু পরে দেখা গেল সূর্য তখনও ডোবেনি।

১০. ভুলে খাওয়ার পর ইচ্ছাকৃত খাওয়া: ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলার পর “আমার রোজা তো ভেঙেই গেছে” এমনটি মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় পানাহার করা।

১১. ভুলে সহবাসের পর পুনরায় সহবাস: ভুলবশত শারীরিক সম্পর্কের পর রোজা ভেঙে গেছে ভেবে পুনরায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করা।

১২. সুবহে সাদিকের পর সহবাস চালিয়ে যাওয়া: রাত মনে করে স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত থাকা, কিন্তু সুবহে সাদিক হয়ে গেছে জানার পরও তৎক্ষণাৎ বিরত না হওয়া।

চিকিৎসা ও শরীরবৃত্তীয় কারণ:

১৩. নাকে বা কানে তরল ওষুধ দেওয়া: নাক বা কানে ড্রপ বা তেল দেওয়ার পর তা যদি কণ্ঠনালী বা পেটে পৌঁছে যায়।

১৪. দাঁতের রক্ত গিলে ফেলা: দাঁত বা মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়ে যদি তা থুতুর পরিমাণের চেয়ে বেশি হয় এবং তা গলার নিচে চলে যায়।

১৫. ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করা: নিজ ইচ্ছায় আঙুল দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে মুখ ভরে বমি করা অথবা বমি আসার পর তা ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা।

১৬. কুলি করার সময় পানি গিলে ফেলা: রোজা স্মরণ আছে, এমন অবস্থায় ওজু বা কুলি করার সময় ভুলবশত পানি কণ্ঠনালীর নিচে চলে যাওয়া।

১৭. জোরপূর্বক পানাহার: কেউ জোরজবরদস্তি করে রোজাদারের মুখে খাবার বা পানীয় প্রবেশ করিয়ে দিলে।

১৮. স্ত্রী সহবাস করা: রোজা অবস্থায় দিনের বেলা ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা (এতে কাজা ও কাফফারা উভয়ই জরুরি)।

১৯. হস্তমৈথুন করা: রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো কাজ করা যার ফলে বীর্যপাত ঘটে।

✅ যেসব কারণে রোজা ভাঙে না

রোজার ব্যাপারে আমাদের সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। নিচের কাজগুলো করলে রোজা ভাঙে না:

  • অনিচ্ছাকৃত বমি: বমি যদি নিজে থেকে আসে (মুখ ভরে হলেও), রোজা ভাঙবে না।
  • ভুলে পানাহার করা: রোজার কথা একেবারেই মনে নেই, এমন অবস্থায় পেট ভরে খেলেও রোজা ভাঙবে না। তবে মনে পড়ার সাথে সাথেই খাওয়া ছেড়ে দিতে হবে।
  • ইনজেকশন বা ইনসুলিন নেওয়া: মাংসে বা রগে ইনজেকশন, ইনসুলিন বা টিকা নিলে রোজা ভাঙে না (তবে গ্লুকোজ বা শক্তিবর্ধক স্যালাইন নেওয়া মাকরূহ)।
  • রক্ত দেওয়া বা টেস্ট করানো: মেডিকেল টেস্টের জন্য রক্ত দিলে রোজা নষ্ট হয় না।
  • চোখে ড্রপ বা সুরমা ব্যবহার: চোখে ওষুধ দিলে বা চুলে কলপ/তেল দিলে রোজা ভাঙে না।
  • স্বপ্নদোষ হওয়া: ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙে না। দ্রুত গোসল করে পবিত্র হয়ে নিতে হবে।
  • নখ বা চুল কাটা: রোজা রেখে নখ, চুল বা অবাঞ্ছিত লোম কাটলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।

⚖️ কাজা ও কাফফারা: পার্থক্য কী?

  • কাজা: ভেঙে যাওয়া রোজার বদলে রমজানের পর নির্দিষ্ট একটি রোজা রাখা।
  • কাফফারা: রোজা ভঙ্গের শাস্তিস্বরূপ একটানা ৬০টি রোজা রাখা অথবা ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো। (সাধারণত ইচ্ছাকৃত পানাহার ও স্ত্রী সহবাসের ক্ষেত্রে কাফফারা ওয়াজিব হয়)।

❓ সাধারণ জিজ্ঞাসা

রোজা রেখে কি নখ বা চুল কাটা যাবে?

হ্যাঁ, রোজা রেখে হাত-পায়ের নখ কাটা, চুল কাটা বা দাড়ি পরিপাটি করাতে কোনো বাধা নেই। এটি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অংশ এবং এর সাথে রোজা ভঙ্গের কোনো সম্পর্ক নেই।

রোজা অবস্থায় বমি হলে কি রোজা ভেঙে যায়?

অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হলে রোজা ভাঙে না। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আঙুল দিয়ে মুখ ভরে বমি করে, তবে রোজা ভেঙে যাবে এবং ওই রোজার কাজা করতে হবে।

রোজা রেখে ব্রাশ বা পেস্ট ব্যবহার করা যাবে কি?

রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট বা মাজন দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা মাকরূহ। যদি পেস্টের ফেনা বা স্বাদ গলার নিচে চলে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। তাই সাহরির সময় শেষ হওয়ার আগেই ব্রাশ করে নেওয়া উত্তম এবং দিনের বেলা মিসওয়াক ব্যবহার করা সুন্নত।

ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভাঙে?

হ্যাঁ, হাঁপানির জন্য মুখে ইনহেলার ব্যবহার করলে এর ভেতরের তরল বা পাউডার ফুসফুস ও পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। তাই রোজা অবস্থায় ইনহেলার নিলে রোজা ভেঙে যাবে। অসুস্থতার কারণে নিতে বাধ্য হলে পরবর্তীতে কাজা করতে হবে।

💡 একটি ছোট্ট পরামর্শ: রোজা শুধুমাত্র উপবাস থাকার নাম নয়, এটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। তাই চোখ, কান ও জবানের হেফাজত করুন এবং মিথ্যা ও গীবত থেকে দূরে থাকুন।

Leave a Comment