চীন কীভাবে মাত্র ৪০ বছরে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত হলো? মাও সে তুং-এর ব্যর্থতা থেকে দং জিয়াওপিং-এর যুগান্তকারী সংস্কার জানুন চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের নেপথ্যের আসল গল্প।
চীনের ধনী হওয়ার মূল কারিগর হলেন দং জিয়াওপিং (Deng Xiaoping)। ১৯৭৮ সালে তিনি চীনের অর্থনীতিকে বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর নেওয়া ৩টি প্রধান পদক্ষেপ চীনকে বদলে দেয়:
১. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার: কারিগরি ও বিজ্ঞান শিক্ষায় সর্বোচ্চ জোর দেওয়া।
২. স্পেশাল ইকোনমিক জোন (SEZ): শেনজেনের মতো উপকূলীয় শহরগুলোতে বিদেশি কোম্পানিদের ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা ও সস্তা শ্রম দিয়ে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করা।
৩. প্রযুক্তির অ্যাডাপ্টেশন: বিদেশি প্রযুক্তি শিখে এবং কপি করে নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা “বিশ্বের কারখানা” (World’s Factory) তৈরি করা।
ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থনীতির শীর্ষে
মাত্র ৭০ বছর আগেও চীনের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য এবং গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটির মানুষ একমুঠো ভাতের জন্য হংকং-এ পালানোর চেষ্টা করত। অথচ আজ সেই চীন ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে আমেরিকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “চীন একটি ঘুমন্ত দৈত্য, তাকে ঘুমাতে দাও। কারণ সে জাগলে পৃথিবী কেঁপে উঠবে।” চীন আজ সত্যিই জেগে উঠেছে। কিন্তু এই জাদুর কাঠিটি কী ছিল?
অন্ধকার অতীত ও মাও সে তুং-এর ভুল নীতি
চীনের পতনের শুরুটা হয়েছিল আফিম যুদ্ধ এবং জাপানের আক্রমণের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর মাও সে তুং কিছু ভুল নীতি গ্রহণ করেন:
- গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড: জোরপূর্বক কৃষি ও শিল্পায়নের চেষ্টা, যা ব্যর্থ হয়।
- সাংস্কৃতিক বিপ্লব: স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শিক্ষিতদের জোর করে কৃষিকাজে পাঠানো হয়।
- ফোর পেস্ট ক্যাম্পেইন: চড়ুই পাখি মারার নির্দেশ, যার ফলে ফসলে পোকা মাকড়ের আক্রমণ বাড়ে এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৪ কোটি মানুষ মারা যায়।
দং জিয়াওপিং এবং চীনের ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৭৬ সালে মাও-এর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন দং জিয়াওপিং। তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী নেতা। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল—
“বিড়াল সাদা না কালো সেটা বড় কথা নয়, বিড়ালটি ইঁদুর ধরছে কিনা সেটাই আসল।”
অর্থাৎ, দেশের উন্নতির জন্য কমিউনিস্ট বা ক্যাপিটালিজম—যে পদ্ধতি কাজ করবে, সেটাই তিনি গ্রহণ করবেন।
দং জিয়াওপিং-এর নেওয়া যুগান্তকারী পদক্ষেপসমূহ:
১. শিক্ষার দুয়ার খুলে দেওয়া
১৯৭৭ সালে তিনি বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুল-কলেজ পুনরায় চালু করেন। হাজার হাজার মেধাবী ছাত্রকে সরকারি খরচে ইউরোপ ও আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠান, এই শর্তে যে তারা ফিরে এসে দেশের হাল ধরবে। দং জানতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া দেশ এগোবে না।
২. অর্থনীতির দরজা উন্মুক্ত করা (Open Door Policy)
১৯৭৮ সালের আগে চীন নিজেকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। দং জিয়াওপিং ইউরোপ ও জাপানের উন্নতি দেখে বুঝতে পারেন, বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া উপায় নেই। তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোকে চীনে ডাকার ব্যবস্থা করেন।
৩. স্পেশাল ইকোনমিক জোন (SEZ) তৈরি
হংকং-এর কাছে শেনজেন (Shenzhen)-কে তিনি চীনের প্রথম স্পেশাল ইকোনমিক জোন ঘোষণা করেন। এখানে বিদেশি কোম্পানিদের জন্য ট্যাক্স মওকুফ এবং সস্তা শ্রমের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে হংকং এবং পশ্চিমা বিশ্বের কোম্পানিগুলো চীনে তাদের ফ্যাক্টরি স্থাপন করতে শুরু করে।
কীভাবে চীন ‘বিশ্বের কারখানা’ হলো?
বিদেশি কোম্পানিগুলো (যেমন: Apple, BMW, Sony) যখন চীনে ফ্যাক্টরি তৈরি করল, চীন তখন একটি চতুর কৌশল নিল। তারা শুধু শ্রমিক দিয়েই ক্ষান্ত হলো না, বরং সেই কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তি (Technology) শিখে নিল।
- রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং: বিদেশি পণ্যের প্রযুক্তি কপি করে তারা সস্তায় নিজস্ব পণ্য তৈরি শুরু করল।
- লোকাল সাপ্লাই চেইন: ধীরে ধীরে প্রতিটি বাড়িতেই ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠল। সুঁচ থেকে শুরু করে রকেট—সবকিছুই চীন তৈরি করতে শুরু করল।
বর্তমান চীন: ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সুপারপাওয়ার
দং জিয়াওপিং জাপানের বুলেট ট্রেন দেখে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, চীন তা পূরণ করেছে।
- বর্তমানে বিশ্বের ৬০% হাইস্পিড রেললাইন চীনে অবস্থিত।
- দারিদ্র্য বিমোচনে চীন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে; প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে তারা দারিদ্র্যসীমার উপরে তুলেছে।
- আধুনিক এআই (AI), ড্রোন এবং মহাকাশ গবেষণায় তারা এখন আমেরিকার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: চীনের উন্নতির জনক কে?
উত্তর: চীনের আধুনিক অর্থনীতির জনক বলা হয় দং জিয়াওপিং (Deng Xiaoping)-কে। তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কারই চীনকে আজকের সুপারপাওয়ার বানিয়েছে।
প্রশ্ন: চীন কীভাবে এত সস্তায় পণ্য তৈরি করে?
উত্তর: চীনের বিশাল জনসংখ্যা (সস্তা শ্রম), সরকারের ভর্তুকি, এবং উন্নত সাপ্লাই চেইনের কারণে তারা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে কম খরচে পণ্য উৎপাদন করতে পারে।
প্রশ্ন: চীনের অর্থনৈতিক উত্থান কবে শুরু হয়?
উত্তর: ১৯৭৮ সালে দং জিয়াওপিং-এর ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ (Reform and Opening-up) নীতির মাধ্যমে চীনের প্রকৃত অর্থনৈতিক উত্থান শুরু হয়।
উপসংহার
চীনের উত্থান কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি হলো সঠিক ভিশন, শিক্ষার প্রসার এবং কঠোর পরিশ্রমের ফসল। মাও সে তুং-এর আমলে যে চীন ছিল দুর্ভিক্ষের নগরী, দং জিয়াওপিং-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে সেই চীন আজ বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি। নিজের দেশের স্বার্থে ইগো পরিহার করে বাণিজ্যের জন্য দরজা খুলে দেওয়াই ছিল চীনের জয়ের মূলমন্ত্র।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind BDTopNews.Com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.