তারাবির নামাজের নিয়ত, নিয়ম ও দোয়া:(বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ)

তারাবির নামাজ কী ও কীভাবে পড়তে হয়? পবিত্র রমজান মাসে এশা এবং বিতর নামাজের মাঝখানে তারাবির নামাজ আদায় করা হয়, যা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাবির নামাজের নিয়ত বাংলায় এভাবে করা যায়: “আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারাবির দুই রাকাত সুন্নত নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।” এই নামাজ ২ রাকাত করে আদায় করতে হয়। প্রতি ৪ রাকাত পরপর বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব এবং এ সময় নির্দিষ্ট তারাবির দোয়া (সুবহানাজিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি…) পড়া হয়। শেষে মোনাজাত করতে হয়।

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য অশেষ রহমত ও বরকতের মাস। এ মাসের একটি অন্যতম বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। অনেকেই তারাবির নামাজের নিয়ত, নিয়ম ও দোয়া সঠিকভাবে জানতে চান। এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে তারাবির নামাজের সম্পূর্ণ নিয়ম, দোয়া এবং মোনাজাত নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার রমজানের ইবাদতকে আরও সহজ ও নির্ভুল করবে।

তারাবির নামাজের নিয়ত

নামাজের মূল বিষয় হলো অন্তরের সংকল্প। আপনি যদি মনে মনে তারাবির নামাজ পড়ার ইচ্ছা করেন, তবে সেটাই আপনার নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে মুখে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব।

আরবি নিয়ত ও উচ্চারণ

نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَىْ صَلٰوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللَّهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ

বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবিহ, সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তায়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।

(বি.দ্র: আপনি যদি মসজিদে ইমামের পেছনে নামাজ পড়েন, তবে ‘মুতাওয়াজ্জিহান ইলা…’ এর আগে ‘ইকতাদাইতু বি হাজাল ইমাম’ শব্দটি যোগ করবেন।)

রোজার নিয়ত বাংলা অর্থ

বাংলা অর্থ: “আমি কেবলামুখী হয়ে শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারাবির দুই রাকাত সুন্নত নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।”

তারাবির নামাজের সঠিক নিয়ম

তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম সাধারণ সুন্নত বা নফল নামাজের মতোই। নিচে সহজে বোঝার জন্য ধাপগুলো দেওয়া হলো:

  • ধাপ ১ (সময়): এশার ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নত নামাজের পর এবং বিতর নামাজের আগে তারাবির নামাজ পড়তে হয়।
  • ধাপ ২ (রাকাত): তারাবি নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করতে হয়।
  • ধাপ ৩ (কেরাত): প্রথম রাকাতে সানা, সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা মেলাবেন। দ্বিতীয় রাকাতেও সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে রুকু-সিজদা করে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরাবেন।
  • ধাপ ৪ (বিশ্রাম ও দোয়া): এভাবে পরপর ৪ রাকাত শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া (তারবিহা) মুস্তাহাব। এই সময়ে তারাবির দোয়া পড়া হয়।
  • ধাপ ৫ (মোনাজাত): সম্পূর্ণ তারাবির নামাজ শেষ হওয়ার পর (অথবা প্রতি ৪ রাকাত পরও করা যায়) সম্মিলিতভাবে বা একাকী তারাবির মোনাজাত করতে হয়। এরপর বিতরের নামাজ পড়তে হয়।

তারাবির নামাজের দোয়া ও মোনাজাত

প্রতি ৪ রাকাত পরপর পড়ার দোয়া

৪ রাকাত পর বসে যে দোয়াটি পড়া হয়, তার বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ নিচে দেওয়া হলো:

বাংলা উচ্চারণ: সুবহানাজিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানাজিল ইয্যাতি ওয়াল আযমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়া-ই ওয়াল জাবারুত। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ।

বাংলা অর্থ: পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই সত্তার, যিনি বিশাল সাম্রাজ্য ও রাজত্বের অধিপতি। পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই সত্তার, যিনি সম্মান, মহত্ত্ব, গাম্ভীর্য, ক্ষমতা, গৌরব ও প্রতাপের অধিকারী। পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই চিরঞ্জীব মালিকের, যাঁর কখনো ঘুম আসে না এবং মৃত্যুও নেই। তিনি অতি পবিত্র ও নিখুঁত; তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং ফেরেশতাকুল ও জিবরাইল (আ.)-এর প্রতিপালক।

তারাবির নামাজের মোনাজাত

পুরো নামাজ শেষে বা প্রতি ৪ রাকাত পর মোনাজাত করা যায়:

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান্নারি; ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান্নারি, বিরাহমাতিকা ইয়া আজিজু, ইয়া গাফফারু, ইয়া কারিমু, ইয়া সাত্তারু, ইয়া রাহিমু, ইয়া জাব্বারু, ইয়া খালিকু, ইয়া বার্রু; আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান্নার, ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নামের আগুন থেকে পানাহ চাইছি। হে জান্নাত ও জাহান্নামের স্রষ্টা! আপনার রহমতের উসিলায় (আমাদের ক্ষমা করুন)। হে পরাক্রমশালী, হে অতিশয় ক্ষমাশীল, হে দয়ালু, হে দোষ গোপনকারী, হে পরম দয়ালু, হে প্রবল প্রতাপশালী, হে সৃষ্টিকর্তা, হে পরম উপকারী! হে আল্লাহ, আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। হে রক্ষাকারী! আপনার রহমতের অসিলায়, হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. তারাবির নামাজ কত রাকাত?

উত্তর: বাংলাদেশে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সাধারণত ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়া হয় এবং এটি যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত আমল। তবে সহিহ হাদিস দ্বারা ৮ রাকাত তারাবির নামাজও প্রমাণিত। তাই ২০ রাকাত পড়াই উত্তম, তবে শারীরিক অক্ষমতা থাকলে ৮ রাকাত পড়লেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।

২. মহিলারা কি ঘরে তারাবির নামাজ পড়তে পারবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, মহিলাদের জন্য নিজ ঘরে বা কামরায় তারাবির নামাজ পড়া সর্বোত্তম। তারা সাধারণ নামাজের মতোই সূরা মিলিয়ে একাকী ২ রাকাত করে তারাবি পড়বেন।

৩. তারাবির দোয়া মুখস্থ না থাকলে করণীয় কী?

উত্তর: যদি তারাবির নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ না থাকে, তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ৪ রাকাত পরপর বিশ্রামের সময় আপনি যেকোনো জিকির (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার), দরুদ শরীফ (দরুদে ইব্রাহিম) বা ইস্তিগফার পড়তে পারেন। চুপ করে বসে থাকলেও কোনো গুনাহ হবে না।

৪. তারাবির নামাজ কি একা পড়া যায়?

উত্তর: তারাবির নামাজ জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। তবে কেউ যদি কোনো কারণে মসজিদে যেতে না পারেন বা ঘরে একা পড়তে চান, তবে তিনি একা একা পড়লেও তারাবির নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে।

শেষকথা

আশা করি, এই আর্টিকেল থেকে তারাবির নিয়ত, নিয়ম ও দোয়া সম্পর্কে আপনার সমস্ত কনফিউশন দূর হয়েছে। ইবাদত করার সময় নিয়ত বা দোয়ার উচ্চারণের চেয়ে অন্তরের ইখলাস ও মনোযোগ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রমজানের আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আপনার যদি এই বিষয়ে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে কমেন্ট করে জানাতে পারেন।

Leave a Comment