ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বিদেশগামী কর্মী ও নারীরা যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, নাগরিকরা বিপদে পড়েই ইউনিয়ন পরিষদে যান, তাই তাদের সাথে কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার করা যাবে না। একইসাথে, জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়ানো বা কমানোর মতো বেআইনি কাজে ঘুষ লেনদেন থেকে নাগরিকদেরও বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে অবহেলা করলে বা বেআইনি কাজের জন্য চাপ দিলে সরাসরি ইউএনও (UNO)-কে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ হলো তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি সেবা পাওয়ার সবচেয়ে কাছের এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান। জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, কিংবা বিভিন্ন নাগরিক সনদের জন্য প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে ভিড় করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এই সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ প্রায়ই হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন।
সম্প্রতি এনটিভি নিউজে সম্প্রচারিত একটি ভিডিওতে এই ভোগান্তি নিরসনে হাসনাত আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কড়া এবং যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন। আজকের এই এক্সপ্লেইনার আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানব, ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে কী ধরনের ভোগান্তি হচ্ছে এবং সেবার মান উন্নত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদে সেবার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?
বিভিন্ন অভিযোগ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি সংক্রান্ত (তহসিলদার) অফিসে সাধারণ মানুষ যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হন, তা নিচে দেওয়া হলো:
- দুর্ব্যবহার ও অসহযোগিতা: অনেক সময় নাগরিকরা, বিশেষ করে নারীরা সেবা নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সাথে ঠিকমতো কথা বলেন না বা ভয়াবহ দুর্ব্যবহার করেন।
- প্রবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের হয়রানি: নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যে মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে যান, তারা জরুরি কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন। এই হয়রানি তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দেয়।
- জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি ও অবহেলা: অনেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিয়মিত অফিসে আসেন না (যেমন ভিডিওতে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ, রাজা মেহের ও সুলতানপুর ইউনিয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাগরিকদের স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানের বাড়িতে পর্যন্ত দৌড়াতে হয়।
- ভূমি অফিসে দীর্ঘসূত্রিতা: ওয়ারিশ সনদ বা ভূমি সংক্রান্ত কাজের জন্য তহসিলদার অফিসে গেলে সাধারণ মানুষকে অনেক সময় অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হয় এবং ভুল সংশোধনের নামে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
সেবার মান উন্নয়নে হাসনাত আব্দুল্লাহর কড়া নির্দেশনাসমূহ
জনগণের দোরগোড়ায় নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
১. ভালো ব্যবহার নিশ্চিত করা: অফিস চলাকালীন সময়ে সেবা নিতে আসা কোনো নাগরিকের সাথে কোনোভাবেই দুর্ব্যবহার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, মানুষ কোনো বিপদে বা প্রয়োজনেই পরিষদে আসেন, অযথা নয়।
২. নারীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ: নারীদের অভিযোগগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং তাদের যেকোনো সেবায় অগ্রাধিকার দিয়ে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে।
৩. দুর্নীতি বা বেআইনি কাজে আপোষ না করা: কোনো মেম্বার বা চেয়ারম্যান যদি নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করতে বাধ্য করেন, তবে সাথে সাথে ঊর্ধ্বতন রিপোর্টিং কর্মকর্তা বা ইউএনও (UNO) মহোদয়কে জানাতে হবে।
৪. সেবা আটকে না রাখা: চেয়ারম্যানরা অফিসে না এলে বা সেবা আটকে রাখলে মানুষের জনবিড়ম্বনা বাড়ে। তাই সবাইকে নিজ নিজ টাস্ক ও দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে।
নাগরিকদের নিজেদেরও যে বিষয়গুলোতে সচেতন হতে হবে
ইউনিয়ন পরিষদে শুধু কর্মকর্তাদেরই নয়, সাধারণ নাগরিকদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। অনেক সময় নাগরিকরা নিজেরাই নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে অনিয়ম করার চেষ্টা করেন:
- বয়স জালিয়াতি থেকে বিরত থাকা: অনেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য জন্মনিবন্ধনে বয়স পরিবর্তন (যেমন ১৬ বছরকে বাড়িয়ে ২২ বা ২৪ বছর) করতে চান। আবার বাল্যবিবাহের উদ্দেশ্যে ১৩ বছর বয়সকে ১৮ বছর বানানোর চেষ্টা করেন। এই ধরনের বেআইনি কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ঘুষ প্রদান বন্ধ করা: নিজেদের বেআইনি কাজগুলো দ্রুত করিয়ে নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের পকেটে ৫০০ টাকা গুঁজে দেওয়ার যে অনৈতিক প্র্যাকটিস রয়েছে, তা সাধারণ নাগরিকদেরই বন্ধ করতে হবে। অন্যায়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
ইউনিয়ন পরিষদে হয়রানির শিকার হলে আপনি কী করবেন?
আপনি যদি ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের হয়রানি, অতিরিক্ত টাকা দাবি বা দুর্ব্যবহারের শিকার হন, তবে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
- সরাসরি অভিযোগ করুন: আপনার উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) বরাবর বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দিন।
- জরুরি সেবা নম্বর: সরকারি সহায়তা ও অভিযোগ কেন্দ্রে জানাতে কল করতে পারেন ৩৩৩ (333) নম্বরে।
- প্রমাণ সংরক্ষণ: হয়রানির শিকার হলে প্রয়োজনীয় প্রমাণ বা কাগজপত্রের কপি নিজের কাছে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইউনিয়ন পরিষদের প্রধান কাজগুলো কী কী?
ইউনিয়ন পরিষদের মূল কাজ হলো তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিকদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব ও চারিত্রিক সনদ প্রদান, গ্রাম আদালত পরিচালনা এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করা।
জন্মনিবন্ধনে বয়স পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব?
না, চাইলেই ইচ্ছামতো জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়ানো বা কমানো সম্ভব নয়। তবে যদি নিবন্ধনের সময় টাইপিং বা টেকনিক্যাল কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে উপযুক্ত প্রমাণ (যেমন- শিক্ষা সনদ, হাসপাতালের জন্ম সনদ, টিকার কার্ড) সাপেক্ষে তা সংশোধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা যায়।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেবা না দিলে কার কাছে অভিযোগ করব?
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো কর্মকর্তা যদি আপনাকে সঠিক সেবা না দেন, অফিসে উপস্থিত না থাকেন বা হয়রানি করেন, তবে আপনি সরাসরি আপনার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) কাছে অভিযোগ করতে পারেন।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।