দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ বন্ধ

ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL)’-এর উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কারণে গত দুই মাস ধরে দেশে ক্রুড তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ১৪ এপ্রিল (মঙ্গলবার) সকাল থেকে এর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশ জ্বালানি বিভাগ আশ্বস্ত করেছে যে, দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তাই বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থায় বা দেশের বাজারে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হওয়ার মূল কারণ কী?

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের এই অচলাবস্থার পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও লজিস্টিক সংকট সরাসরি জড়িত। ধাপে ধাপে কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি: ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে গত প্রায় দুই মাস ধরে বাংলাদেশে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের চালান আসা বন্ধ রয়েছে।
  • রিজার্ভ বা মজুত শেষ হয়ে যাওয়া: সরবরাহ না থাকায় রিফাইনারির নিজস্ব ট্যাংকারে থাকা ক্রুড অয়েলের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। সর্বশেষ রোববার বিকেলে তেল পরিশোধন করা হয় এবং মঙ্গলবার সকাল থেকে প্ল্যান্টটি পুরোপুরি শাটডাউন করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
  • উৎপাদন কমিয়ে আনা: ইস্টার্ন রিফাইনারি সাধারণত দিনে গড়ে ৪,৫০০ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে সক্ষম। কিন্তু সংকটের আভাস পেয়ে গত মার্চ মাস থেকেই উৎপাদন কমিয়ে দৈনিক ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মজুত তলানিতে ঠেকায় কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়েছে।

তেলের সরবরাহ ও বাজারে এর কী প্রভাব পড়বে?

সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— রিফাইনারি বন্ধ হলে কি দেশে তেলের দাম বাড়বে বা পরিবহন খাতে সংকট তৈরি হবে?

বাংলাদেশ জ্বালানি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ:

১. দেশে বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের (Refined Fuel) পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

২. পাম্প বা ডিলার পর্যায়ে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

৩. বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) বিকল্প উপায়ে পরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে।

সুতরাং, গ্রাহক পর্যায়ে এখনই প্যানিক বায়িং (Panic Buying) বা বাড়তি তেল মজুত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কবে নাগাদ পুনরায় চালু হতে পারে ইস্টার্ন রিফাইনারি?

ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত আশাবাদী যে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী:

  • নতুন চালানের অপেক্ষা: ক্রুড অয়েলের নতুন চালান দেশে এসে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
  • সম্ভাব্য সময়সীমা: আগামী মে মাসে ক্রুড অয়েলের নতুন শিপমেন্ট বা চালান দেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেটি আনলোড হওয়ার পরপরই রিফাইনারির পরিশোধন কার্যক্রম আবার পুরোদমে চালু করা হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছে।

মানুষ আরও যা জানতে চায়

ইস্টার্ন রিফাইনারি কোথায় অবস্থিত এবং এর কাজ কী?

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার, যার প্রধান কাজ হলো বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) পরিশোধন করে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি (যেমন: অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল) তৈরি করা।

দেশে কি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা আছে?

বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কোনো সরাসরি সম্ভাবনা নেই। কারণ, জ্বালানি বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে দেশে পরিশোধিত তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলে দেশের বাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল থাকবে।

ক্রুড অয়েল এবং পরিশোধিত তেলের মধ্যে পার্থক্য কী?

ক্রুড অয়েল বা খনিজ তেল হলো প্রাকৃতিক খনি থেকে সরাসরি তোলা অপরিশোধিত তেল, যা সরাসরি ইঞ্জিন বা মেশিনে ব্যবহার করা যায় না। অন্যদিকে, রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করার পর যে তেল (ডিজেল, পেট্রোল ইত্যাদি) পাওয়া যায়, তাকে পরিশোধিত তেল বলে।

(সতর্কীকরণ: এই আর্টিকেলের তথ্যসমূহ ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ খবরের ভিত্তিতে তৈরি। জ্বালানি বাজারের যেকোনো আপডেটের জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সরকারি ঘোষণা অনুসরণ করুন।)

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জ্বালানি বিভাগ ও জাতীয় সংবাদ মাধ্যম

Leave a Comment