বর্তমানে আমাদের জীবন যাতায়াত থেকে শুরু করে রান্নাঘর পর্যন্ত তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, এই ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ বা কালো সোনা মাটির এত নিচে কোথা থেকে আসে? অনেকেরই ধারণা তেল ডাইনোসরের দেহাবশেষ থেকে তৈরি, কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। আজকের আর্টিকেলে আমরা তেলের জন্মকথা এবং এর বিস্ময়কর শোধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানবো।
তেল আসলে কীভাবে তৈরি হয়?
পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল মূলত তৈরি হয় সমুদ্রের নিচে কোটি কোটি বছর ধরে চাপা পড়া ক্ষুদ্র শৈবাল (Algae) ও প্লাঙ্কটন (Plankton) থেকে। ডাইনোসরের জন্মের অনেক আগেই এই ক্ষুদ্র জীবগুলো মারা গিয়ে সমুদ্রের তলদেশে কাদা ও পলির নিচে আটকা পড়ে। লক্ষ লক্ষ বছরের প্রচণ্ড তাপ এবং ভূগর্ভস্থ চাপের ফলে এই জৈব পদার্থগুলো রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে তরল পেট্রোলিয়ামে পরিণত হয়।
তেল নিয়ে প্রচলিত বড় একটি ভুল ধারণা
আমরা ছোটবেলা থেকে অনেক সময় শুনে আসছি যে, ডাইনোসর মারা যাওয়ার পর তাদের হাড়গোড় থেকে তেল তৈরি হয়েছে। এটি আসলে একটি ভুল ধারণা।
- আসল তথ্য: তেল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল প্রায় ২৫ থেকে ৩৬ কোটি বছর আগে, যা ডাইনোসরদের যুগের অনেক আগের ঘটনা।
- বিজ্ঞাপনের প্রভাব: ১৯৩০-এর দশকে ‘সিনক্লেয়ার অয়েল’ নামে একটি কোম্পানি তাদের প্রচারণায় ডাইনোসরের লোগো ব্যবহার শুরু করে। সেখান থেকেই মানুষের মনে এই ধারণাটি গেঁথে যায় যে তেলের উৎস হলো ডাইনোসর।
পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের ইতিহাস
তেল আবিষ্কারের আগে মানুষ আলোর জন্য মূলত তিমির শরীরের তেলের (Whale Oil) ওপর নির্ভর করত। কিন্তু তিমির সংখ্যা কমে যাওয়ায় মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।
- ১৮৪৬ সাল: কানাডিয়ান বিজ্ঞানী আব্রাহাম গেসনার প্রথম কয়লা ও তেল থেকে কেরোসিন তৈরি করেন।
- ১৮৫৯ সাল: আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় আধুনিক পদ্ধতিতে বিশ্বের প্রথম তেল কূপ খনন করা হয়। এর মাধ্যমেই শুরু হয় আধুনিক পেট্রোলিয়াম যুগের।
মাটির নিচ থেকে তেল উত্তোলন
খনিজ তেল বা কাঁচা তেল (Crude Oil) সাধারণত মাটির ১.৫ থেকে ৪ কিলোমিটার গভীরে পাথরের স্তরে আটকা পড়ে থাকে। বিশাল ড্রিলিং মেশিনের সাহায্যে এই তেল পাম্প করে উপরে তোলা হয়। শুরুতে প্রাকৃতিকভাবে তেলের চাপে এটি উপরে উঠে এলেও পরবর্তীতে পাম্পিং মেশিনের প্রয়োজন হয়।
তেল শোধন প্রক্রিয়া
মাটির নিচ থেকে যে তেল পাওয়া যায় তা সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। এটি অত্যন্ত ঘন এবং দুর্গন্ধযুক্ত। এই কাঁচা তেলকে ‘ফ্র্যাকশনাল ডিস্টিলেশন’ (Fractional Distillation) প্রক্রিয়ায় শোধন করা হয়।
একটি বিশাল টাওয়ারে কাঁচা তেলকে প্রায় ৩৫০-৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত করা হয়। তাপমাত্রা অনুযায়ী তেলের বিভিন্ন উপাদান আলাদা আলাদা স্তরে জমা হয়:
- সবচেয়ে উপরে: এলপিজি (রান্নার গ্যাস)।
- মাঝের স্তরে: পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং বিমান জ্বালানি (ATF)।
- নিচের স্তরে: লুব্রিকেটিং অয়েল ও বিটুমিন (রাস্তা তৈরির পিচ)।
বিশ্বের বৃহত্তম রিফাইনারি কোথায়?
অনেকেই মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের বৃহত্তম অয়েল রিফাইনারি ভারতের গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রির এই রিফাইনারি প্রতিদিন প্রায় ১.২ মিলিয়ন ব্যারেল কাঁচা তেল প্রসেস করতে পারে।
উপসংহার
তেল কেবল একটি জ্বালানি নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার রক্তপ্রবাহ। সমুদ্রের ক্ষুদ্র জীব থেকে তৈরি এই প্রাকৃতিক সম্পদ আজ পুরো পৃথিবীর চাকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। তবে তেলের মজুদ সীমিত হওয়ায় পৃথিবী এখন নবায়নযোগ্য শক্তির দিকেও ঝুঁকছে।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।