ইরানের নতুন ডিফেন্স সিস্টেম: অপ্রতিরোধ্য মার্কিন যুদ্ধবিমান কীভাবে ভূপাতিত হলো?

সম্প্রতি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনার মধ্যেই ইরান দাবি করেছে যে তারা মার্কিন এফ-সিরিজের যুদ্ধবিমান এবং একটি এ-১০ (A-10) ফাইটার জেট ভূপাতিত করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই অসাধ্য সাধন করেছে রাডার-নির্ভর নয় এমন ‘প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর’ (Passive Infrared Sensor) যুক্ত ডিফেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে, যা মার্কিন বিমানের রাডার জ্যামিং প্রযুক্তিকে সহজেই ফাঁকি দিতে সক্ষম। এছাড়াও নিজস্ব প্রযুক্তির ‘খোরদাদ-১৫’ (Khordad 15) এবং ‘বাভার-৩৭৩’ (Bavar 373) এর মতো শক্তিশালী সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম এই সাফল্যের নেপথ্যে থাকতে পারে।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার বোমাবর্ষণের মুখে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আসলেই কতটা কার্যকর, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। বিশেষ করে ইসরাইল যখন দাবি করে যে তারা ইরানের ১২০টি ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস করে ফেলেছে, তখন মনে হচ্ছিল ইরান হয়তো কোণঠাসা।

কিন্তু যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে এসে ইরান এমন এক চমক দেখিয়েছে যা মার্কিন সমরাস্ত্রের “অপ্রতিরোধ্য” তকমা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কোন প্রযুক্তি এবং কৌশলের মাধ্যমে ইরান এই অসম্ভবকে সম্ভব করল।

মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার নেপথ্যে কী?

যুদ্ধকালীন গোপনীয়তা ও কৌশলের কারণে ইরান তাদের ব্যবহৃত নতুন এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক নাম এখনো প্রকাশ করেনি। তবে তারা সফলভাবে একটি মার্কিন এফ-সিরিজ এবং একটি এ-১০ ফাইটার জেট ভূপাতিত করেছে। এই ঘটনা সামরিক বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, এর পেছনে সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রযুক্তি অথবা পূর্বেকার শক্তিশালী সিস্টেমগুলোর আপগ্রেড ভার্সন কাজ করছে।

ইরানের ব্যবহৃত সম্ভাব্য শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমসমূহ

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক সিস্টেম ব্যবহার করে ইরান এই সফলতা পেয়ে থাকতে পারে:

  • খোরদাদ-১৫ (Khordad 15): এটি ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি মোবাইল সারফেস-টু-এয়ার (Surface-to-Air) ডিফেন্স সিস্টেম। এর রেঞ্জ বা পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি যুদ্ধের ময়দানে মাত্র ৫ মিনিটে মোতায়েন করা যায়। আগেও মার্কিন ড্রোন বা আকাশযান ধ্বংসে এটি সফলতা পেয়েছে।
  • এস-৩০০ (S-300): রাশিয়ার তৈরি এই অত্যাধুনিক ডিফেন্স সিস্টেমের চারটি ব্যাটারি ইরান ২০১৬ সালে হাতে পায়। ইসরাইল এর দুটি ব্যাটারি ধ্বংসের দাবি করলেও, বাকিগুলো এখনো ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।
  • বাভার-৩৭৩ (Bavar 373): সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হলো রুশ এস-৩০০ সিস্টেমের সম্পূর্ণ ইরানি সংস্করণ। এটি দূরপাল্লার যেকোনো লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে পারে।
  • অ্যাডাপ্টেড এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল: সারফেস সিস্টেমের পাশাপাশি ইরানের কাছে রাশিয়ার আর-২৭ (R-27) এবং চীনের পিএল (PL) সিরিজের মতো শক্তিশালী এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলো সরাসরি মার্কিন যুদ্ধবিমানের সঙ্গে লড়তে সক্ষম।

রাডার ফাঁকি দেওয়া মার্কিন বিমানগুলো কীভাবে শনাক্ত হলো?

মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো সারাবিশ্বে তাদের ‘স্টিলথ’ বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু তারপরও ইরান এগুলোকে কীভাবে নিজেদের রাডারে আটকে ফেলল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে একটি বিশেষ প্রযুক্তিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান হয়তো এমন কোনো নতুন সিস্টেম ব্যবহার করেছে যা প্রচলিত রাডারের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর পরিবর্তে তারা প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর (Passive Infrared Sensor) ব্যবহার করছে।

প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর যেভাবে কাজ করে:

  1. সাধারণ রাডার সিস্টেম রেডিও ওয়েভ বা তরঙ্গ পাঠিয়ে বিমান শনাক্ত করে, যা মার্কিন জ্যামিং সিস্টেম সহজেই ব্লক করে দিতে পারে।
  2. অন্যদিকে, প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর কোনো তরঙ্গ পাঠায় না। এটি সরাসরি বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত প্রচণ্ড তাপ (Heat signature) শনাক্ত করে।
  3. যেহেতু এটি কোনো সিগন্যাল ছাড়ে না, তাই মার্কিন রাডার জ্যামিং প্রযুক্তি এর বিরুদ্ধে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরাও এই একই কৌশল ব্যবহার করে বড় ধরনের সফলতা পেয়েছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. ইরান সম্প্রতি কোন ধরনের মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে?

ইরান সম্প্রতি এফ-সিরিজের একটি ফাইটার জেট এবং একটি এ-১০ (A-10) যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে।

২. খোরদাদ-১৫ (Khordad 15) কী এবং এর ক্ষমতা কতটুকু?

খোরদাদ-১৫ হলো ইরানের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মোবাইল সারফেস-টু-এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এর পাল্লা ১৫০ কিলোমিটার এবং এটি যেকোনো জায়গায় মাত্র ৫ মিনিটে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

৩. বাভার-৩৭৩ (Bavar 373) ডিফেন্স সিস্টেম কী?

বাভার-৩৭৩ হলো রাশিয়ার এস-৩০০ (S-300) ডিফেন্স সিস্টেমের আদলে তৈরি একটি উন্নত ইরানি সংস্করণ, যা দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

৪. প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর কীভাবে রাডার জ্যামিং এড়িয়ে কাজ করে?

প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সর প্রচলিত রাডার তরঙ্গের পরিবর্তে সরাসরি বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া তাপ শনাক্ত করে কাজ করে। ফলে শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক রাডার জ্যামিং প্রযুক্তি এই সেন্সরটিকে জ্যাম বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে না।

শেষকথা

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ট্যাকটিকাল পরিবর্তনের মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে যে আকাশ প্রতিরক্ষায় তারা পিছিয়ে নেই। প্যাসিভ ইনফ্রারেড সেন্সরের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্য ও সমরাস্ত্রের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যারা সমরাস্ত্র ও বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে আপডেট থাকতে চান, তাদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বড় কেস স্টাডি।

Leave a Comment