জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ‘রেজোলিউশন ১৭৩৭’

সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ‘স্ন্যাপব্যাক’ (Snapback) মেকানিজম নিয়ে এক রুদ্ধদ্বার বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের দাবি অনুযায়ী, ইরান তাদের পরমাণু চুক্তির (JCPOA) শর্ত ভঙ্গ করে ৬০% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাকে (IAEA) অসহযোগিতা করছে। এর ফলে ২০০৬ সালের ‘রেজোলিউশন ১৭৩৭’ সহ জাতিসংঘের অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় বহাল হয়েছে। তবে, রাশিয়া এবং চীন এই স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কেন এই নতুন সংকট?

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সম্প্রতি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে “নন-প্রোলিফারেশন” (অস্ত্র বিস্তার রোধ) এবং ১৭৩৭ কমিটির কার্যক্রম নিয়ে একটি বিশেষ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল:

  • ১৭৩৭ কমিটির ৯০ দিনের কাজের রিপোর্ট পর্যালোচনা করা।
  • ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বা “স্ন্যাপব্যাক” মেকানিজম কার্যকর করা।
  • মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং ইরানের ড্রোন ও মিসাইল কর্মসূচির বিস্তার রোধ করা।

রেজোলিউশন ১৭৩৭ এবং ‘স্ন্যাপব্যাক’ মেকানিজম কী?

বিষয়টি সহজে বুঝতে হলে আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ টার্ম সম্পর্কে জানতে হবে:

  • রেজোলিউশন ১৭৩৭: এটি ২০০৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত একটি প্রস্তাব, যার মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা (যেমন: অস্ত্র নিধিনিষেধ, ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক সম্পদ জব্দ) আরোপ করা হয়েছিল।
  • স্ন্যাপব্যাক মেকানিজম (Snapback Mechanism): ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তির (JCPOA) অধীনে এই শর্ত ছিল যে, যদি ইরান চুক্তির কোনো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ভঙ্গ করে, তবে পূর্বের স্থগিত করা সকল নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় ফিরে আসবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স) দাবি কী?

পশ্চিমা দেশগুলোর মতে, ইরান বর্তমানে পরমাণু চুক্তির কোনো শর্তই মানছে না। তাদের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:

  • ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: ইরান বর্তমানে ৬০% পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার খুব কাছাকাছি।
  • বিপুল পরিমাণ মজুত: ফ্রান্সের দাবি অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৫০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
  • IAEA কে অসহযোগিতা: গত আট মাসের বেশি সময় ধরে ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের (IAEA) তাদের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি (E3) গত বছর এই স্ন্যাপব্যাক মেকানিজম চালু করে, যা ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সম্পন্ন হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে।

রাশিয়া ও চীনের শক্ত অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে রাশিয়া এবং চীন। তাদের যুক্তিগুলো হলো:

  • অবৈধ পদক্ষেপ: রাশিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে একতরফাভাবে JCPOA চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই পশ্চিমা দেশগুলোর এই স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়া চালু করার কোনো আইনি অধিকার নেই।
  • রেজোলিউশন ২২৩১-এর মেয়াদ শেষ: চীন এবং রাশিয়ার মতে, পরমাণু চুক্তির মূল ভিত্তি ‘রেজোলিউশন ২২৩১’-এর মেয়াদ গত বছরের ১৮ অক্টোবর শেষ হয়ে গেছে, তাই নতুন করে ১৭৩৭ কমিটি বা নিষেধাজ্ঞা চালুর কোনো সুযোগ নেই।
  • রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে নিরাপত্তা পরিষদকে ব্যবহার করছে।

বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব ও উপসংহার

এই মুহূর্তে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরান ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিষ্কারভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা, যারা কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে থামাতে চাইছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন, যারা এই নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে মনে করছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।

যতক্ষণ পর্যন্ত এই পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না পৌঁছাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. JCPOA চুক্তি কী?

JCPOA (Joint Comprehensive Plan of Action) হলো ২০১৫ সালে ইরান এবং বিশ্বের ছয়টি পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি) মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। এর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

২. স্ন্যাপব্যাক (Snapback) বলতে কী বোঝায়?

স্ন্যাপব্যাক হলো পরমাণু চুক্তির এমন একটি ধারা, যার মাধ্যমে চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে পূর্বের বাতিল হওয়া জাতিসংঘের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুনরায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলবৎ হয়ে যায়।

৩. ইরান কি সত্যিই পারমাণবিক বোমা বানাচ্ছে?

ইরান সবসময় দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের জন্য। তবে পশ্চিমা দেশগুলো এবং IAEA-এর আশঙ্কা, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে।

৪. রাশিয়া ও চীন কেন ইরানকে সমর্থন করছে?

রাশিয়া এবং চীন মনে করে যে, এই সংকটের মূল কারণ হলো ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া। এছাড়া, ইরানের সাথে এই দেশগুলোর গভীর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: আর্টিকেলটি সাধারণ পাঠকদের জন্য তথ্য সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে )

Leave a Comment