জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রবাসীদের নতুন যুগ: রেকর্ড রেমিট্যান্স ও ভোটাধিকার অর্জন

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে প্রবাসীদের অবস্থান এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা নিয়ে ‘সাউথ এরা নেটওয়ার্ক’-এর ৮ম পর্বে (South Era Network Episode 08) গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গত ১৮ মাসে প্রবাসীদের জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, তার দুটি প্রধান দিক হলো অর্থনীতিতে রেকর্ড অবদান এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে ভোটাধিকার অর্জন।

এই আর্টিকেলে আমরা জানব কীভাবে প্রবাসীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’-এর তকমা ঘুচিয়ে দেশের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠলেন এবং আসন্ন নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত হলো।

সাউথ এরা নেটওয়ার্ক এপিসোড ০৮-এর মূল বার্তা

সাউথ এরা নেটওয়ার্কের ৮ম পর্বে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের রূপান্তর তুলে ধরা হয়েছে। এই পর্বের প্রধান দুটি হাইলাইট হলো:

১. রেকর্ড রেমিট্যান্স: হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রবাসীদের আস্থা ফেরায় ২০২৪ সালে ঐতিহাসিক ২৬.৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

২. ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ: দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রবাসীদের ভোটাধিকার দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১.৫৩ মিলিয়ন (১৫ লক্ষ ৩০ হাজার) প্রবাসী কর্মী পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন।

অর্থনীতিতে প্রবাসীদের আস্থার প্রতিফলন

দেশের ক্রান্তিলগ্নে প্রবাসীরা সব সময়ই পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়টা ছিল ভিন্ন। সাউথ এরা নেটওয়ার্কের তথ্যমতে, সরকার পরিবর্তনের পর প্রবাসীদের মধ্যে দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সাড়া দেখা যায়।

২০২৪ সালে রেমিট্যান্সের ঐতিহাসিক লম্ফ

২০২৪ সালটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি মাইলফলক বছর ছিল। এই এক বছরে প্রবাসীরা বৈধ পথে ২৬.৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।

কেন এই হঠাৎ বৃদ্ধি?

  • আস্থার প্রত্যাবর্তন: আগের সরকারের আমলে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বেশি ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছতা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনার কারণে প্রবাসীদের আস্থা ফিরে আসে।
  • দেশ গঠনের তাগিদ: অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার অংশীদার হতে প্রবাসীরা বৈধ পথে বেশি করে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ থেকে রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার

সাউথ এরা নেটওয়ার্কের এপিসোডে একটি বেদনাদায়ক সত্য তুলে ধরা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রবাসী কর্মীরা প্রায়শই ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব পেত না।

কিন্তু বর্তমান সরকার সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষায় সরকার এখন অনেক বেশি সক্রিয়।

মালয়েশিয়ায় আটকে পড়া কর্মীদের নতুন আশা

সরকারের এই সক্রিয় ভূমিকার একটি বড় উদাহরণ হলো মালয়েশিয়া শ্রমবাজার ইস্যু। বিভিন্ন জটিলতায় মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা বা সেখানে গিয়েও বৈধ হতে না পারা কর্মীদের বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গুরুত্বের সাথে নেন।

  • ড. ইউনূস সরাসরি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে পুনরায় আলোচনা শুরু করেন।
  • এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে প্রায় ১৮,০০০ আটকে পড়া বাংলাদেশী কর্মীকে বৈধ করার বা তাদের সমস্যা সমাধানের একটি পথ তৈরি হয়েছে, যা আগের আমলে অকল্পনীয় ছিল।

প্রবাসীদের ঐতিহাসিক ভোটাধিকার অর্জন

প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও, এতদিন দেশের নীতিনির্ধারণে বা সরকার নির্বাচনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সাউথ এরা নেটওয়ার্ক এপিসোড ০৮-এ এই বিষয়টিকে একটি প্রধান পরিবর্তন বা ‘Major Shift’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পোস্টাল ব্যালটে নির্বাচনের প্রস্তুতি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করেছে। এটি কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে রূপদান করা হয়েছে।

  • পদ্ধতি: প্রবাসীরা যাতে সহজেই ভোট দিতে পারেন, সেজন্য ‘পোস্টাল ব্যালট’ (Postal Ballot) পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
  • অভূতপূর্ব সাড়া: আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই ১.৫৩ মিলিয়ন (১৫ লক্ষ ৩০ হাজার-এর বেশি) প্রবাসী কর্মী পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে নিজেদের নাম নিবন্ধন করেছেন।

এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে কতটা উন্মুখ ছিলেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

পাঠকদের মনে থাকা প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নের উত্তর এখানে দেওয়া হলো:

১. প্রবাসীরা কীভাবে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন নিয়মে প্রবাসীরা ‘পোস্টাল ব্যালট’-এর মাধ্যমে ভোট দেবেন। এজন্য তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়েছে।

২. ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স কেন এত বেড়েছিল?

মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের প্রতি আস্থা এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপের কারণে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেকর্ড পরিমাণ (২৬.৯ বিলিয়ন ডলার) টাকা পাঠিয়েছেন।

৩. সাউথ এরা নেটওয়ার্ক এপিসোড ০৮-এ কোন সময়কাল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে?

এই এপিসোডে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

শেষ কথা

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ প্রবাসীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তারা এখন আর কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধা নন, তারা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারও প্রত্যক্ষ অংশীদার। রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এবং ভোটাধিকার প্রাপ্তি এই দুটি অর্জন প্রমাণ করে যে নতুন বাংলাদেশে প্রবাসীদের যথাযথ মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।

সোর্স: সাউথ এরা নেটওয়ার্ক এপিসোড ০৮ (South Era Network Episode 08), বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য (জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত)।

Leave a Comment