স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম স্থাপত্য শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের একুশে পদক (Ekushey Padak 2026) লাভ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন স্থপতি, যিনি ২০১৬ সালে বাইতুর রউফ মসজিদের জন্য আগা খান অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৫ সালে তাঁর উদ্ভাবনী ‘খুদি বাড়ি’ (Khudi Bari) প্রকল্পের জন্য বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেন। তাঁর কাজ মূলত জলবায়ু সহনশীলতা এবং স্থানীয় উপাদানের ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত।
কেন মেরিনা তাবাসসুম একুশে পদক পেলেন?
একুশে পদক বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। মেরিনা তাবাসসুমকে এই সম্মানে ভূষিত করার প্রধান কারণ হলো স্থাপত্যকে তিনি কেবল নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং একে মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন।
তার কাজের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- পরিবেশবান্ধব নকশা: প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার।
- স্থানীয় উপাদান: ইট ও মাটির ব্যবহার যা বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা: বন্যার্ত ও চরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যের ঘর তৈরি।
মেরিনা তাবাসসুমের উল্লেখযোগ্য কাজ ও অর্জন
মেরিনা তাবাসসুমের ক্যারিয়ারে এমন কিছু কাজ রয়েছে যা তাঁকে এই অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নিচে তাঁর প্রধান দুটি প্রজেক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাইতুর রউফ মসজিদ (Bait Ur Rouf Mosque)
ঢাকার অদূরে অবস্থিত এই মসজিদটি গতানুগতিক মসজিদের নকশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
- স্বীকৃতি: এই নকশার জন্য তিনি ২০১৬ সালে সম্মানজনক আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড জিতেন।
- বিশেষত্ব: এখানে কোনো কৃত্রিম শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি নেই। প্রাকৃতিক আলো এবং বাতাস চলাচলের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্মাণ করা হয়েছে, যা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়।
২. খুদি বাড়ি (Khudi Bari)
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক আশীর্বাদ।
- উদ্দেশ্য: চরাঞ্চলের মানুষ যারা নিয়মিত বন্যা ও নদী ভাঙনের শিকার হয়, তাদের জন্য এই ঘর।
- গঠন: এটি একটি মডুলার স্ট্রাকচার বা সহজে স্থাপনযোগ্য ঘর। বাঁশ ও স্টিলের জয়েট দিয়ে তৈরি এই ঘর বন্যার সময় খুব দ্রুত খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়।
- খরচ: অত্যন্ত কম খরচে তৈরি এই ঘরটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই সমাধান।
স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম কে?
মেরিনা তাবাসসুম বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা স্থপতি। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। তাঁর স্থাপত্য দর্শন হলো “স্থাপত্য হবে মাটির কাছাকাছি এবং মানুষের প্রয়োজনে।” তিনি ‘মেরিনা তাবাসসুম আর্কিটেক্টস’ (MTA)-এর প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন।
কেন এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য গর্বের?
মেরিনা তাবাসসুমের একুশে পদক প্রাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী এখন বিশ্বমানের।
- গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং: তাঁর কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম বিশ্ব দরবারে সম্মানের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে।
- তরুণদের অনুপ্রেরণা: নতুন প্রজন্মের স্থপতিরা এখন পরিবেশবান্ধব এবং জনকল্যাণমুখী কাজে উৎসাহিত হচ্ছেন।
- সমস্যার সমাধান: তাঁর ‘খুদি বাড়ি’ কনসেপ্টটি বাংলাদেশের বন্যা সমস্যার মোকাবিলায় একটি বাস্তবসম্মত সমাধান।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
মেরিনা তাবাসসুম কেন বিখ্যাত?
মেরিনা তাবাসসুম তাঁর পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যশৈলী, বিশেষ করে বাইতুর রউফ মসজিদ এবং ‘খুদি বাড়ি’ প্রকল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। তিনি আগা খান অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী একজন স্থপতি।
২০২৬ সালের একুশে পদক কে পেয়েছেন?
স্থাপত্য শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ২০২৬ সালের একুশে পদক পেয়েছেন। উপদেষ্টা পরিষদের সভার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
‘খুদি বাড়ি’ কী?
‘খুদি বাড়ি’ হলো মেরিনা তাবাসসুমের ডিজাইন করা একটি স্বল্পমূল্যের, বহনযোগ্য ঘর। এটি বিশেষ করে বাংলাদেশের চরাঞ্চলের বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়।
পাঠকদের জন্য কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: একুশে পদক কি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা?
উত্তর: না, একুশে পদক বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। সর্বোচ্চ সম্মাননা হলো ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’।
প্রশ্ন: মেরিনা তাবাসসুমের নকশা করা মসজিদটি কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: বাইতুর রউফ মসজিদটি ঢাকার দক্ষিণখানে অবস্থিত।
প্রশ্ন: মেরিনা তাবাসসুম আর্কিটেক্টস (MTA) কী?
উত্তর: এটি মেরিনা তাবাসসুমের নিজস্ব স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে তিনি তাঁর সকল প্রজেক্ট পরিচালনা করেন।
শেষকথা
স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের একুশে পদক ২০২৬ প্রাপ্তি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্পের জন্য এক মাইলফলক। তাঁর কাজ আমাদের শেখায় যে, আধুনিকতা মানে কেবল গ্লাস আর কংক্রিট নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মিশে মানুষের সমস্যার সমাধান করা। ‘খুদি বাড়ি’র মতো প্রজেক্টগুলো প্রমাণ করে যে, একজন স্থপতি চাইলেই সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।