ইন্টারনেট আসলে কীভাবে আমাদের কাছে পৌঁছায়? অনেকের ধারণা ইন্টারনেট আকাশ বা স্যাটেলাইট থেকে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ৯৭% পরিবাহিত হয় সমুদ্রের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে। মানুষের চুলের মতো সূক্ষ্ম ফাইবার অপটিক (Fiber Optic) তারের ভেতর দিয়ে আলোর গতিতে ডেটা এক দেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছায়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৫৫৯টি সক্রিয় সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে, যা পৃথিবীকে একটি জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে।
আপনি যখন এই আর্টিকেলটি পড়ছেন, তখন সেই ডেটা হয়তো হাজার হাজার মাইল দূর থেকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে আপনার ডিভাইসে আসছে। আধুনিক সভ্যতা ও গ্লোবাল ইকোনমি পুরোপুরি এই তারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কীভাবে সমুদ্রের হাজার ফুট নিচে এই ক্যাবল বসানো হয়? হাঙ্গর বা জাহাজের নোঙ্গর কি এগুলো কেটে ফেলে না? চলুন, সমুদ্রের গভীরের এই অজানা জগত সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
সাবমেরিন ক্যাবল কী এবং কীভাবে কাজ করে?
সাবমেরিন ক্যাবল হলো এক ধরনের বিশেষায়িত তার যা মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে এক মহাদেশকে আরেক মহাদেশের সাথে যুক্ত করে।
- প্রযুক্তি: এর মূল প্রযুক্তি হলো ‘ফাইবার অপটিকস’। এর ভেতরে কাঁচের মতো স্বচ্ছ তন্তু থাকে। ‘টোটাল ইন্টারনাল রিফলেকশন’ বা পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন পদ্ধতিতে আলোর সিগন্যাল হিসেবে ডেটা পারাপার হয়।
- গঠন: যদিও এগুলো দিয়ে টেরাবাইট গতির ডেটা যায়, তবুও এর মূল অংশটি একটি সাধারণ পানির পাইপ বা গার্ডেন হোস-এর সমান চওড়া। তবে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এর ওপরে সিলিকন, স্টিল, কপার এবং প্লাস্টিকের মজবুত আস্তরণ থাকে।
ইতিহাস: ১৮৫০ থেকে ২০২৪
সমুদ্রের নিচ দিয়ে যোগাযোগ নতুন কিছু নয়।
- ১৮৫০ সাল: ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রথম আন্ডারসি ক্যাবল বসানো হয় (তখন ছিল টেলিগ্রাফের জন্য)।
- বর্তমান অবস্থা: এখন সারা বিশ্বে প্রায় ৮ লক্ষ মাইলেরও বেশি দৈর্ঘ্যের ক্যাবল রয়েছে, যা পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের দ্বিগুণ।
ক্যাবল কি হাঙ্গর কেটে ফেলে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, সমুদ্রের নিচে এই ক্যাবলগুলো কি নিরাপদ?
- হাঙ্গরের আক্রমণ: ২০১৪ সালে গুগলের একটি ক্যাবল হাঙ্গর কামড়ে দিয়েছিল বলে শোনা যায়। হাঙ্গর মূলত বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবে বর্তমানে ক্যাবলের ওপর বিশেষ প্রোটেকশন থাকায় এটি এখন আর বড় ঝুঁকি নয়।
- আসল শত্রু: সাবমেরিন ক্যাবলের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো মাছ ধরার ট্রলার এবং জাহাজের নোঙ্গর। সমুদ্রের তলদেশে নোঙ্গর ফেলার সময় অসাবধানতাবশত তার কেটে যাওয়ার ঘটনাই বেশি ঘটে। এছাড়া মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূমিকম্পেও ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভয়ের কিছু নেই: একটি ক্যাবল কাটা পড়লে আপনার ইন্টারনেট বন্ধ হবে না। কারণ কোম্পানিগুলো একাধিক বিকল্প রুট বা ব্যাকআপ লাইন ব্যবহার করে।
মালিকানা কার? গুগল নাকি ফেসবুক?
আগে এই ক্যাবলগুলোর মালিক ছিল বড় বড় টেলিকম কোম্পানি (যেমন: AT&T, BT)। কিন্তু গত ২০ বছরে চিত্র বদলে গেছে। এখন ইন্টারনেটের চাহিদার বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে টেক জায়ান্টরা।
- বিগ টেক ইনভেস্টমেন্ট: গুগল, মেটা (ফেসবুক), অ্যামাজন এবং মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিরা এখন নিজেরাই হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ক্যাবল বসাচ্ছে।
- উদাহরণ: গুগলের ‘ইকুইয়ানো’ (Equiano) বা ফেসবুকের ‘২আফ্রিকা’ (2Africa) প্রজেক্ট এর বড় প্রমাণ।
ইলন মাস্কের স্টারলিংক কি ক্যাবলের ভবিষ্যৎ শেষ করে দেবে?
অনেকে ভাবছেন, ইলন মাস্কের স্টারলিংক বা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট হয়তো সাবমেরিন ক্যাবলকে অচল করে দেবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকেও তা সম্ভব নয়। কারণ:
১. খরচ: স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
২. গতি ও ল্যাটেন্সি: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গতির সাথে স্যাটেলাইট এখনো পাল্লা দিতে পারেনি।
৩. আবহাওয়া: খারাপ আবহাওয়ায় স্যাটেলাইট সিগন্যাল ব্যাহত হয়, যা ক্যাবলে হয় না।
তাই, উচ্চগতির এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের জন্য সাবমেরিন ক্যাবলই এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে বসানো হয়?
উত্তর: বিশেষ ধরনের জাহাজ বা ‘ক্যাবল লেয়ার শিপ’-এর মাধ্যমে এটি বসানো হয়। প্রথমে সমুদ্রের তলদেশের ম্যাপ তৈরি করে নিরাপদ রুট ঠিক করা হয়, তারপর ধীরে ধীরে তারগুলো নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন: ইন্টারনেট কি স্যাটেলাইট দিয়ে চলে?
উত্তর: না, ইন্টারনেটের মাত্র ৩% স্যাটেলাইট দিয়ে চলে (মূলত দুর্গম এলাকায়)। বাকি ৯৭% ইন্টারনেট সমুদ্রের তলদেশের অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল দিয়েই বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত হয়।
প্রশ্ন: ক্যাবল কেটে গেলে ইন্টারনেট চলে কীভাবে?
উত্তর: ইন্টারনেট ব্যবস্থা একটি জালের মতো। একদিকের তার কেটে গেলে অটোমেটিক সিস্টেমে অন্য রুটের ক্যাবল দিয়ে ডেটা পাঠানো হয়, ফলে ব্যবহারকারীরা সাধারণত টের পান না।
উপসংহার
আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি মেসেজ এবং ভিডিও কল সমুদ্রের গভীর তলদেশ দিয়ে আলোর গতিতে ছুটে চলে। যদিও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এগোচ্ছে, তবুও পৃথিবীর মেরুদণ্ড হিসেবে সাবমেরিন ক্যাবল আগামী বহু বছর রাজত্ব করবে। সমুদ্রের নিচে শুয়ে থাকা এই তারগুলোই আসলে আমাদের গ্লোবাল ভিলেজের অদৃশ্য সুতো।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind BDTopNews.Com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.