আজকের যে আরব ভূখণ্ড বা মধ্যপ্রাচ্য আমরা দেখি, কোটি বছর আগে তা ছিল টেথিস (Tethys) সমুদ্রের তলদেশ। এই সমুদ্রের নিচে জমা হওয়া ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও জুওপ্লাঙ্কটন-এর মতো কোটি কোটি সামুদ্রিক অণুজীব মাটির নিচে চাপা পড়ে উচ্চ তাপ ও চাপে অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) ও গ্যাসে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র শুকিয়ে মরুভূমি হলেও, সেই তেল মাটির নিচেই থেকে যায়। আরবের মাটির গঠন এমন যে, এখানে তেলের স্তর ভূপৃষ্ঠের অনেক কাছাকাছি, যা উত্তোলন করা সহজ ও লাভজনক।
বালির নিচে লুকানো কালো সোনা
আমরা সবাই জানি, মধ্যপ্রাচ্য মানেই তেলের খনি। পৃথিবীর মোট তেলের প্রায় ৪৮% এবং গ্যাসের ৩৮% এই অঞ্চলেই পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তেল তৈরি হয় সমুদ্রের নিচে সামুদ্রিক প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে। তাহলে এই ধুধু মরুভূমিতে এত তেল এলো কীভাবে?
চলুন জেনে নিই, কীভাবে প্রাচীন সমুদ্র আজকের তেলের খনিতে পরিণত হলো।
টেথিস সমুদ্র
আজ আমরা যে আরব ভূখণ্ড দেখছি, ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি বছর আগে তা ছিল টেথিস সমুদ্রের তলদেশে।
- সমুদ্রের নিচে জীবন: সেই সময় এই সমুদ্রে প্রচুর পরিমাণে শ্যাওলা, ফাইটোপ্লাঙ্কটন (উদ্ভিদ কণা) এবং জুওপ্লাঙ্কটন (প্রাণী কণা) ছিল।
- পলি জমা: কোটি কোটি বছর ধরে এই অণুজীবগুলো মারা গিয়ে সমুদ্রের তলদেশে জমা হতে থাকে এবং বালির স্তরে চাপা পড়ে।
- তাপ ও চাপের খেলা: মাটির গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে প্রচণ্ড তাপ ও চাপে এই জৈব উপাদানগুলো পচে তেল ও গ্যাসে রূপান্তরিত হয়।
কয়লা বনাম তেল: কয়লা তৈরি হয় মাটির উপরের গাছপালা পচে। কিন্তু তেল (Crude Oil) তৈরি হয় সমুদ্রের অণুজীব বা মাইক্রো-অর্গানিজম থেকে। তাই কয়লা ও তেল এক জিনিস নয়।
প্লেট টেকটোনিক্স
৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি বিশাল পরিবর্তন ঘটে।
- হিমালয়ের জন্ম: ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট এসে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালা তৈরি হয়।
- মধ্যপ্রাচ্যের উত্থান: এই একই সংঘর্ষের ফলে টেথিস সমুদ্র সংকুচিত হয়ে শুকিয়ে যায় এবং সমুদ্রের তলদেশ ওপরে উঠে এসে আজকের মধ্যপ্রাচ্য বা আরব ভূখণ্ডের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, সমুদ্র হারিয়ে গেল, কিন্তু তার নিচে জমানো তেলের ভাণ্ডার ঠিকই মাটির নিচে আটকা পড়ে রইল।
কেন মধ্যপ্রাচ্যে তেল তোলা এত সহজ?
অন্যান্য দেশের (যেমন আমেরিকা বা রাশিয়া) তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে তেল উত্তোলন অনেক সহজ এবং সাশ্রয়ী। এর কারণ কী? অনলাইনে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী:
- মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের স্তর মাটির (ভূপৃষ্ঠের) অনেক কাছাকাছি।
- প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি সমুদ্রের তলদেশ ছিল এবং টেকটোনিক প্লেটের নিচু অংশে অবস্থিত ছিল।
- ফলে এখানে খুব বেশি গভীর গর্ত বা ড্রিলিং না করেই তেলের স্তরে পৌঁছানো যায়, যা অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভজনক।
তেলের ভবিষ্যৎ ও বিকল্প শক্তি
যদিও আরবের তেল দিয়ে আজ পৃথিবী চলছে, তবে এটি অফুরন্ত নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি একসময় শেষ হয়ে যাবে। তাই এখন বিশ্ব ঝুঁকছে বিকল্প শক্তির দিকে:
- সোলার এনার্জি বা সৌর বিদ্যুৎ
- বায়ু বিদ্যুৎ
- বায়োফুয়েল ও ইলেকট্রিক গাড়ি
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: মরুভূমিতে তেল কীভাবে এলো?
উত্তর: কোটি বছর আগে আরবের মরুভূমি ছিল টেথিস সমুদ্রের তলদেশ। সেখানকার সামুদ্রিক অণুজীব (প্লাঙ্কটন) মাটির নিচে চাপা পড়ে উচ্চ তাপে তেলে পরিণত হয়েছে। পরে ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র সরে গিয়ে সেখানে মরুভূমি তৈরি হয়, কিন্তু তেল মাটির নিচেই থেকে যায়।
প্রশ্ন: অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল কী থেকে তৈরি হয়?
উত্তর: ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল তৈরি হয় মূলত সমুদ্রের তলদেশে জমা হওয়া মৃত ফাইটোপ্লাঙ্কটন এবং জুওপ্লাঙ্কটন (একধরনের আণুবীক্ষণিক জীব) থেকে।
প্রশ্ন: মধ্যপ্রাচ্যে পৃথিবীর কত শতাংশ তেল আছে?
উত্তর: পৃথিবীর মোট অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) প্রায় ৪৮% এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩৮% মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সঞ্চিত আছে।
উপসংহার
আরবের তেলের খনি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি পৃথিবীর কোটি বছরের ভৌগোলিক পরিবর্তনের এক অনন্য ফসল। একসময়ের বিশাল সমুদ্র আজ আমাদের জ্বালানি যোগাচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, তাই আমাদের এখন থেকেই পরিবেশবান্ধব বিকল্প শক্তির কথা ভাবতে হবে।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।