আল কোরআনে বর্ণিত ‘সাত আসমান’ আসলে কী? বিজ্ঞান ও ইসলাম কী বলে?

পবিত্র কোরআনের সূরা মুলক ও সূরা ফুসসিলাত অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বকে সাতটি স্তরে বা সাত আসমানে (Sab’a Samawat) বিভক্ত করেছেন। মুফাসসির ও ইসলামি স্কলারদের মতে:

  • প্রথম আসমান (সামা আদ-দুনিয়া): আমরা খালি চোখে বা টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশে যত নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা যা কিছু দেখি, তার সবকিছুই এই “প্রথম আসমান” বা নিকটবর্তী আকাশের অন্তর্ভুক্ত।
  • বাকি ছয় আসমান: প্রথম আসমানের ওপরে বা বাইরে আরও ছয়টি অদৃশ্য স্তর রয়েছে, যা এখনো মানুষের দৃশ্যমান জগতের বা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির নাগালের বাইরে।

আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন অসীম মহাকাশ দেখতে পাই। বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের যেটুকু আবিষ্কার করতে পেরেছে, তা কি সম্পূর্ণ? নাকি এর বাইরেও অজানা জগত আছে? ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন তিনি “সাতটি আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন”

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুঁজব কোরআনের এই সাত আসমানের বাস্তবিক অর্থ কী? আধুনিক বিজ্ঞান কি এর কোনো প্রমাণ পেয়েছে? এবং নাস্তিকদের প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর কী?

সাত আসমান কি বায়ুমণ্ডলের স্তর?

অনেকে ভুল করে ভাবেন, বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত বায়ুমণ্ডলের ৭টি স্তরই (যেমন: ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার) হয়তো কোরআনের সাত আসমান। কিন্তু মুফাসসিরগণ এই ধারণা নাকচ করেছেন।

কোরআনের সূরা ফুসসিলাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

“আমি নিকটবর্তী আকাশকে (প্রথম আসমান) প্রদীপমালা (নক্ষত্র) দ্বারা সুসজ্জিত করেছি।”

যেহেতু নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে থাকে না, বরং মহাকাশে থাকে—তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সাত আসমান বায়ুমণ্ডল নয়, বরং এটি মহাকাশের বা মহাবিশ্বের বিশাল সাতটি স্তর বা জগত।

বিজ্ঞান কী বলে? মহাকাশের কি আসলেই ৭টি স্তর আছে?

নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা প্রশ্ন করেন, “বিজ্ঞান তো সাত আসমানের প্রমাণ পায়নি, তাহলে এটি কি কাল্পনিক?” এর উত্তরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে:

বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও অসীম মহাবিশ্ব

মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও মহাবিশ্বের শেষ সীমানা দেখতে পায় না। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন “Observable Universe” বা দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। তারা নিজেরাই স্বীকার করেন, এর বাইরে কী আছে তা অজানা। যেই মহাবিশ্বের সীমানাই বিজ্ঞান মাপতে পারেনি, সেখানে স্তর নেই—এ কথা দাবি করা অবৈজ্ঞানিক।

ড. হালুক নূরের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

তুর্কি মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. হালুক নূর আধুনিক মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বকে গঠনগতভাবে ৭টি সম্ভাব্য স্তরে ভাগ করার একটি তত্ত্ব দিয়েছেন:

১. সৌরজগত (Solar System)

২. মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি

৩. লোকাল গ্রুপ (গ্যালাক্সি গুচ্ছ)

৪. মহাজাগতিক কেন্দ্রীয় বলয়

৫. কোয়াসার বা রেডিও সোর্স

৬. মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীল ক্ষেত্র

৭. মহাবিশ্বের অসীমতা

যদিও এটি চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে এটি দেখায় যে মহাকাশকে স্তরে স্তরে ভাগ করা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও যৌক্তিক।

ধরুন, একটি আলমারিতে ৭টি ড্রয়ার আছে এবং প্রতি ড্রয়ারে অনেকগুলো কলম আছে। এখন যদি কেউ বলে, “এখানে তো শুধু শত শত কলম দেখা যাচ্ছে, ড্রয়ার বা তাক কোথায়?” তবে সেটি ভুল হবে।

ঠিক তেমনি, মহাকাশে কোটি কোটি নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থাকা মানে এই নয় যে সেখানে কোনো স্তর বা ভাগ নেই। নক্ষত্রগুলো হলো আলমারির কলমের মতো, আর আসমানগুলো হলো ড্রয়ার বা স্তরের মতো।

সাত আসমানের নাম ও দূরত্ব

বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম গাজালী (রহ.) তাঁর ‘মুকাশাফাতুল কুলুব’ কিতাবে সাত আসমানের কিছু নাম ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন (যদিও এগুলো আধ্যাত্মিক বর্ণনা):

  • প্রথম আসমান (রোকিয়া): দুধের চেয়েও সাদা।
  • দ্বিতীয় আসমান (ফাইদুম): লৌহ দ্বারা নির্মিত।
  • তৃতীয় আসমান (মালাকুত): তামা দ্বারা নির্মিত।
  • (এভাবে সপ্তম আসমান পর্যন্ত বিভিন্ন রত্ন ও উপাদানের বর্ণনা রয়েছে)।

হাদিস শরীফ অনুযায়ী, এক আসমান থেকে আরেক আসমানের দূরত্ব ৫০০ বছরের পথ। এটি রূপক হতে পারে বা আলোকবর্ষের হিসেবেও হতে পারে, যা আল্লাহই ভালো জানেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: আমরা কি সাত আসমান দেখতে পাই?

উত্তর: না। আমরা খালি চোখে বা টেলিস্কোপ দিয়ে যা দেখি (চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি)—তা সবই “প্রথম আসমানের” অন্তর্গত। বাকি ছয়টি আসমান আমাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে।

প্রশ্ন: সাত আসমানের কথা কোন সূরায় আছে?

উত্তর: পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারাহ (২৯), সূরা ইসরা (৪৪), সূরা মুমিনুন (৮৬), সূরা ফুসসিলাত (১২), সূরা মুলক (৩) এবং সূরা নূহ (১৫)-সহ মোট সাতটি স্থানে সাত আসমানের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন: বিজ্ঞান কি সাত আসমান অস্বীকার করে?

উত্তর: না। বিজ্ঞান মহাবিশ্বের গঠন নিয়ে এখনো গবেষণা করছে। বিগ ব্যাং থিওরি এবং মাল্টিভার্স (Multiverse) বা বহু-মহাবিশ্বের ধারণা কোরআনের সাত আসমানের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

উপসংহার

মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞান যা জানে, তার চেয়ে যা জানে না তার পরিমাণ অনেক বেশি। ১৪০০ বছর আগে কোরআন যখন ভ্রূণতত্ত্ব বা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কথা বলেছিল, তখনো বিজ্ঞান তা জানত না। ঠিক তেমনি, সাত আসমানের বিষয়টিও হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের কাছে আরও পরিষ্কার হবে। বিশ্বাসীদের জন্য এটি আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক নিদর্শন।

Leave a Comment