জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই দিনগুলোতে নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় এমনকি জিহাদের চেয়েও। আল্লাহ তাআলা নিজে সুরা ফজরে এই দিনগুলোর কসম খেয়েছেন। এই দশদিনে রোজা, তাকবির, জিকির, তওবা, কুরআন তিলাওয়াত ও আরাফার দিন (৯ জিলহজ) বিশেষভাবে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
জিলহজ্জ মাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হিজরি বর্ষের ১২তম মাস হলো জিলহজ্জ। এটি ৪টি সম্মানিত মাসের একটি, যেখানে আল্লাহ তাআলা বিশেষ ইবাদতের সুযোগ রেখেছেন। এই মাসেই হজ অনুষ্ঠিত হয়, ঈদুল আযহা পালিত হয় এবং কুরবানি করা হয়।
২০২৫ সালে (১৪৪৬ হিজরি) বাংলাদেশে জিলহজ মাস শুরু হয়েছে ২৯ মে এবং ঈদুল আযহা পালিত হচ্ছে ৭ জুন (১০ জিলহজ)। অর্থাৎ জিলহজ মাসের প্রথম ১০টি দিন ২৯ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত।
জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত কুরআনে কী বলা হয়েছে?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সুরা ফজরের প্রথম দুই আয়াতে এই দিনগুলোর কসম খেয়েছেন:
“শপথ ভোরবেলার! এবং শপথ দশ রাতের!” — (সুরা ফজর: ১-২)
তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ প্রায় সকল মুফাসসিরের মতে, এই “দশ রাত” বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত বোঝানো হয়েছে।
এছাড়া সুরা হজের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করো” — মুফাসসিরগণ বলেন, এই “নির্দিষ্ট দিনগুলো” মানে জিলহজের প্রথম দশদিন।
হাদিসে জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত
১. বছরের সেরা দিন
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“এমন কোনো দিন নেই, যেদিন নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম দশদিন) তুলনায় বেশি প্রিয়।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৬৯)
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়?” রাসুল (সা.) বললেন, “না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয় — তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হলো এবং কিছুই ফিরিয়ে আনলো না।”
২. জিলহজের দিনগুলো বছরের শ্রেষ্ঠ দিন
হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবিজি (সা.) বলেছেন:
“দুনিয়ার সেরা দিন হলো আশারায়ে জিলহজ (জিলহজের প্রথম দশদিন)।”
— (মুসনাদে আহমদ)
৩. জিলহজের আমল জিহাদের সমতুল্য
হাদিসে এসেছে, এই দশদিনে একদিনের রোজা এক বছরের রোজার সমান এবং একরাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের সমান সওয়াব বহন করে (তিরমিজি)।
জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল কী কী?
এই দশদিনে যেসব আমল বিশেষভাবে করণীয়, তা নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:
✅ ১. বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পড়া
আল্লাহর জিকির করা এই দিনগুলোর সর্বোত্তম আমল। পড়বেন:
- তাকবির: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ
- তাহমিদ: আলহামদুলিল্লাহ
- তাহলিল: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
- তাসবিহ: সুবহানাল্লাহ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) এই দিনগুলোতে বাজারে বের হয়ে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন এবং মানুষও তাদের সাথে তাকবির বলত।
✅ ২. নফল রোজা রাখা (বিশেষত ৯ জিলহজ)
জিলহজের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষত ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজা রাখলে গত ও আগামী দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়।
“আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আশাবাদী যে, আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।”
— (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
মনে রাখবেন: ১০ জিলহজ (ঈদের দিন) রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
✅ ৩. কুরআন তিলাওয়াত বাড়ানো
এই দিনগুলোতে প্রতিদিন কমপক্ষে এক পারা বা তার বেশি কুরআন তিলাওয়াতের চেষ্টা করুন। তর্তিব রেখে পাঠ করা ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা আরও বেশি সওয়াবের কাজ।
✅ ৪. তওবা ও ইস্তিগফার করা
এই দিনগুলো আত্মশুদ্ধির সেরা সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক আদম সন্তান পাপী, আর পাপীদের মধ্যে সেরা তারা যারা তওবা করে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫১)
তওবার জন্য প্রতিদিন বেশি বেশি পড়ুন: “আস্তাগফিরুল্লাহাল আযিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতুবু ইলাইহি।”
✅ ৫. বেশি বেশি দান-সদকা করা
এই দিনগুলোতে দান-সদকার প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অসহায়, এতিম ও গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ান। মসজিদে, মাদরাসায় বা সরাসরি প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কাছে দান করুন।
✅ ৬. নামাজ যত্নসহকারে আদায় করা
ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ বাড়ান। বিশেষত তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত ও আওয়াবিন নামাজ পড়ার চেষ্টা করুন।
✅ ৭. হজ পালন করা (সামর্থ্যবানদের জন্য)
যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের জন্য এই দিনগুলোতে হজ পালন করা ফরজ ইবাদত এবং জীবনের সেরা নেক কাজগুলোর একটি।
✅ ৮. কুরবানি করা (ঈদের দিন)
১০ জিলহজ সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। এটি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মরণীয় সুন্নাহ।
✅ ৯. চুল ও নখ না কাটা (কুরবানিদাতার জন্য)
যারা কুরবানি দেবেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানির আগ পর্যন্ত চুল, নখ ও অপ্রয়োজনীয় লোম না কাটা মুস্তাহাব বা সুন্নাহ।
“যখন তোমরা জিলহজ মাসের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ যদি কুরবানি করতে চায়, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।”
— (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭৭)
গুরুত্বপূর্ণ: এই বিধান শুধু কুরবানিদাতার জন্য, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নয়।
✅ ১০. বেশি বেশি দরুদ পড়া
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপর বেশি করে দরুদ পাঠ করা এই দিনগুলোতে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ।
আরাফার দিন (৯ জিলহজ) কেন এত বিশেষ?
৯ জিলহজ হলো ইয়াওমে আরাফা বা আরাফার দিন — এই দিনটি ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্যাদাবান দিনগুলোর একটি।
- এই দিনে হজযাত্রীরা আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন, যা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন।
- হাদিসে এসেছে, এই দিনে আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
- ৯ জিলহজ দিবাগত রাত (মুজদালিফার রাত) অত্যন্ত বরকতপূর্ণ।
- এই দিন রোজা রাখলে দুই বছরের গুনাহ মাফ হয় (সহিহ মুসলিম)।
২০২৫ সালে আরাফার দিন: বাংলাদেশে ৬ জুন ২০২৫ (বৃহস্পতিবার)।
জিলহজের দশটি দিনের মর্যাদা কেন রমযানের চেয়ে আলাদা?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে — রমযান কি জিলহজের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান?
আলেমগণ বলেন:
- রমযানের রাত (বিশেষত লাইলাতুল কদর) জিলহজের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
- জিলহজের দিন রমযানের দিনের চেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ।
কারণ জিলহজের দিনগুলোতে হজ, আরাফা, কুরবানি ও ঈদ — এই চারটি মহান ইবাদত একসাথে পালন করা হয়, যা অন্য কোনো মাসে সম্ভব নয়।
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনে কী কী করা নিষেধ?
- ১০ জিলহজ (ঈদের দিন) রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
- কুরবানিদাতার জন্য চুল, নখ না কাটা মুস্তাহাব — তবে অতিরিক্ত লম্বা বা অপবিত্র হলে কাটা যাবে।
- গুনাহের কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ করণীয়: একটি দৈনিক রুটিন
জিলহজের প্রথম নয়দিনের জন্য একটি সহজ দৈনিক রুটিন:
ফজরের আগে:
- তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ুন
- ইস্তিগফার করুন
ফজরের পরে:
- কুরআন তিলাওয়াত করুন (কমপক্ষে ১ পারা)
- সূর্যোদয়ের পর ইশরাক নামাজ পড়ুন
দিনের বেলা:
- যেকোনো সময় তাকবির পড়তে থাকুন
- একটি সদকা করুন (যত সামান্যই হোক)
মাগরিব ও এশার পরে:
- আওয়াবিন নামাজ পড়ুন
- দরুদ ও দোয়া করুন
৯ জিলহজ (আরাফার দিন):
- অবশ্যই রোজা রাখুন
- বেশি বেশি দোয়া করুন
জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের তাৎপর্য
| দিন | বিশেষ ঘটনা/আমল |
|---|---|
| ১-৮ জিলহজ | রোজা, জিকির, তিলাওয়াত, দান |
| ৮ জিলহজ | ইয়াওমুত তারবিয়া (হজযাত্রীরা মিনায় যান) |
| ৯ জিলহজ | ইয়াওমে আরাফা — আরাফার রোজা, দোয়া |
| ১০ জিলহজ | ঈদুল আযহা, কুরবানি, হালক বা কসর |
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন কি রমযানের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান?
উত্তর: দিনের দিক থেকে জিলহজের প্রথম ১০ দিন রমযানের দিনের চেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ বলে অনেক আলেম মত দেন। কারণ এই দিনগুলোতে হজ, আরাফা ও কুরবানি একসাথে মিলিত হয়। তবে রমযানের রাত (বিশেষত শেষ দশকের লাইলাতুল কদর) জিলহজের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
প্রশ্ন ২: জিলহজের প্রথম ১০ দিন কি নফল রোজা রাখা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। ১ থেকে ৯ জিলহজ নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষত ৯ জিলহজ (আরাফার দিন) রোজা রাখলে দুই বছরের গুনাহ মাফ হওয়ার ব্যাপারে হাদিস রয়েছে। তবে ১০ জিলহজ (ঈদের দিন) রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন ৩: জিলহজ মাসে চুল ও নখ না কাটা কি ফরজ?
উত্তর: না, ফরজ নয়। কুরবানিদাতার জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানির আগ পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব (উত্তম)। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হাম্বলি, শাফেয়ি ও মালেকি মতে কাটা থেকে বিরত থাকা আরও জোরালোভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে যারা কুরবানি দেবেন না, তাদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।
প্রশ্ন ৪: আরাফার দিনের রোজার ফজিলত কী?
উত্তর: সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজা রাখলে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করা হয়। এটি বছরের সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজাগুলোর একটি।
প্রশ্ন ৫: জিলহজের প্রথম দশদিনে তাকবির কখন পড়তে হয়?
উত্তর: জিলহজ মাসের ১ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত তাকবিরে তাশরিক পড়া সুন্নত। ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে তাকবির পড়া ওয়াজিব (হানাফি মতে)।
প্রশ্ন ৬: জিলহজের আমল কি শুধু হজযাত্রীদের জন্য?
উত্তর: না। যারা হজে যাচ্ছেন না, তারাও ঘরে বসে এই দিনগুলোর ফজিলত পেতে পারেন। রোজা, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, তওবা ও নফল নামাজের মাধ্যমে। রাসুল (সা.) নিজেও বলেছেন, এই দিনগুলোতে যেকোনো নেক আমল সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত হয়।
শেষকথা
জিলহজ মাসের প্রথম দশদিন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অসাধারণ উপহার। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে এই দিনগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব বারবার বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলিম পরিবারে কুরবানির প্রস্তুতির পাশাপাশি এই দশদিনকে ইবাদতের দিন হিসেবে কাটানো উচিত। পরিবারের ছোটদের এই দিনগুলোর ফজিলত শেখান, একসাথে নামাজ পড়ুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং দান-সদকায় অংশ নিন।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দশদিনের পূর্ণ ফায়দা নেওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- সহিহ বুখারি — হাদিস: ৯৬৯
- সহিহ মুসলিম — হাদিস: ১১৬২, ১৯৭৭
- ইবনে মাজাহ — হাদিস: ৪২৫১
- মুসনাদে আহমদ — হাদিস: ২৬৬৬১
- তাফসিরে ইবনে কাসির — সুরা ফজর ব্যাখ্যা
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।