ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (শিক্ষার্থীদের কাছে যিনি ‘মোনামি ম্যাম’ হিসেবে পরিচিত)। সোমবার, ১১ মে ২০২৬ তারিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি নিজের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর ঠিক আগের দিন (১০ মে ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ ব্যক্তিগত কারণ ও মূল একাডেমিক বিভাগে সময় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন। মূলত সাবেক প্রক্টরের পদত্যাগের পর এবং টানা ২০ মাস জুলাই-পরবর্তী উত্তপ্ত ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের পর, নিজের মূল পেশা শিক্ষকতা ও গবেষণায় সময় দিতেই তিনি এই প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বর্তমানে ঢাবির নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রামাণিক রতন।
দায়িত্ব ছাড়ার মূল কারণসমূহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই দায়িত্ব ত্যাগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে নানা কৌতূহল তৈরি হয়েছে। শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামির দেওয়া বক্তব্য ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে পদত্যাগের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রেক্ষাপট উঠে আসে:
১. প্রশাসনিক দায়িত্বে অনাগ্রহ ও শিক্ষকতায় ফেরা
ফেসবুক পোস্টে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিয়ে তার দীর্ঘ ৭ বছরের শিক্ষকতা ক্যারিয়ারে কখনোই প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা তার ছিল না। তিনি মূলত একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবেই থাকতে চেয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় তিনি পুনরায় তার মূল গবেষণাধর্মী ও একাডেমিক কাজে মনোযোগ দিতে চান।
২. দায়িত্ব গ্রহণের পেছনের আবেগ ও ‘নতুন বাংলাদেশ’
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট যখন তৎকালীন প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ তাকে ফোন করে সহকারী প্রক্টর হওয়ার আহ্বান জানান, তখন তিনি বেশ অবাক ও রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকরা যে দায়িত্ব পান, একজন তরুণ সহকারী অধ্যাপক হিসেবে সেই দায়িত্ব পাওয়াটা তার জন্য বিরাট সম্মানের ছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন এবং নিজের প্রাণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (আলমা ম্যাটার) জন্য ভালো কিছু করার তাগিদ থেকেই তিনি সে সময় দায়িত্ব গ্রহণে রাজি হয়েছিলেন।
৩. সাবেক প্রক্টরের প্রতি আনুগত্য ও টিমের মেয়াদপূর্তি
শেহরীন মোনামির দায়িত্ব গ্রহণের অন্যতম বড় কারণ ছিলেন তার নিজ বিভাগের বড় ভাই ও প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ। গত ২০ মাস (প্রায় ২ বছর) তিনি সাইফুদ্দীন স্যারের কাছ থেকে শিখেছেন কীভাবে উত্তপ্ত ও সংকটময় পরিস্থিতিতে অতিমানবীয় ধৈর্য ধারণ করতে হয় এবং হাসিমুখে নির্বিকার থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। যেহেতু ১০ মে ২০২৬ তারিখে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেছেন, তাই তার টিমের একজন বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে শেহরীন মোনামিও দায়িত্ব হস্তান্তর করাটাই যৌক্তিক মনে করেছেন।
সংকটকালে শিক্ষার্থীদের প্রতি আচরণ ও অভিজ্ঞতা
জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এই সময়ে প্রক্টোরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে মোনামি ম্যাম তার পোস্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন:
- মমতা ও ক্ষমার দৃষ্টিভঙ্গি: ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের শাস্তির বদলে ক্ষমা ও মমতায় আগলে রাখার নীতি গ্রহণ করেছিলেন সাবেক প্রক্টর। পুরো টিম সেই নীতি অনুসরণ করেই কাজ করেছে।
- সফলতার হিসাব না করা: নিজের মেয়াদে তিনি কতটা সফল বা ব্যর্থ, তার কোনো হিসাব তিনি করতে চান না। তবে অসাধারণ একজন নেতার অধীনে চমৎকার একটি টিমের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি বলে মনে করেন ।
- নজিরবিহীন পরিস্থিতি: জুলাই ও জুলাই-পরবর্তী সময়ের মতো পরিস্থিতি এ দেশে আর আসবে কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো প্রক্টর ও তার টিমকে সম্ভবত এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হয়তো হতে হবে না।
📅 সাম্প্রতিক প্রশাসনিক রদবদল
পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক প্রক্টোরিয়াল রদবদলের সঠিক ও ভেরিফাইড তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| তারিখ | ঘটনা ও পদক্ষেপ |
| ২৮ আগস্ট, ২০২৪ | গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাবির প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন সাইফুদ্দীন আহমদ; সহকারী প্রক্টর হন শেহরীন মোনামি। |
| ১০ মে, ২০২৬ | টানা ২০ মাস দায়িত্ব পালনের পর ক্যাম্পাস স্থিতিশীল উল্লেখ করে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদের পদত্যাগ। |
| ১০ মে, ২০২৬ | ঢাবির নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রামাণিক রতন-কে নিয়োগ প্রদান। |
| ১১ মে, ২০২৬ | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বার্তার মাধ্যমে সহকারী প্রক্টর শেহরীন মোনামির পদত্যাগ ঘোষণা। |
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে—শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন রদবদলে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তায় কোনো ব্যাঘাত ঘটবে কি না।
বাস্তব সমাধান ও আশ্বস্তবার্তা: এই পদত্যাগ কোনো ধরনের সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার কারণে ঘটেনি। বরং দীর্ঘ ২০ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে ক্যাম্পাসকে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পর, এটি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া। নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রামাণিক রতন ইতোমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডি তাদের নিয়মিত কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করছে। শেহরীন মোনামি নিজেও তার বার্তায় নতুন প্রক্টর ও তার টিমের প্রতি পূর্ণাঙ্গ শুভকামনা জানিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
১. শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি কে?
উত্তর: শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন (Public Administration) বিভাগের একজন জনপ্রিয় সহকারী অধ্যাপক। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি অত্যন্ত পরিচিত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সরব। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনি ঢাবির সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রক্টর কে?
উত্তর: ১০ মে ২০২৬ তারিখে সাবেক প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদের পদত্যাগের পর, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রামাণিক রতন (Md. Israfil Prang Ratan)।
৩. ঢাবির প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টররা কেন পদত্যাগ করলেন?
উত্তর: এটি কোনো দ্বন্দ্বের জেরে নয়; বরং ব্যক্তিগত কারণ, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং নিজেদের মূল একাডেমিক ও গবেষণার কাজে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা পদত্যাগ করেছেন। সাবেক প্রক্টরের মতে, গত ২০ মাসে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বর্তমানে যথেষ্ট স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই এখন নতুনদের হাতে দায়িত্ব দেওয়ার উপযুক্ত সময়।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।