দেড় বছর আত্মগোপনের পর সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার

৭ এপ্রিল ২০২৬ ভোরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বাংলাদেশের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে লালবাগ থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর আদালত তার জামিন ও রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।

দীর্ঘ দেড় বছরের জল্পনা-কল্পনা ও রহস্যের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কীভাবে তিনি এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন, কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং আদালতে তার সর্বশেষ পরিস্থিতি কী— এই আর্টিকেলে আমরা এসব প্রশ্নের বিস্তারিত এবং বস্তুনিষ্ঠ উত্তর জানবো।

কীভাবে ও কোথা থেকে গ্রেপ্তার হলেন শিরীন শারমিন?

টানা দেড় বছর গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চললেও শেষ রক্ষা হয়নি সাবেক এই স্পিকারের। তার গ্রেপ্তারের ঘটনাক্রম ছিল নিম্নরূপ:

  • সময় ও স্থান: ৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) ২০২৬, ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।
  • যিনি গ্রেপ্তার করেন: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি বিশেষ দল এই অভিযান পরিচালনা করে।
  • ডিএমপির বক্তব্য: ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, শিরীন শারমিন দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন।

দীর্ঘ দেড় বছর কোথায় আত্মগোপনে ছিলেন তিনি?

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের মতো তিনিও জনরোষ থেকে বাঁচতে আত্মগোপনে চলে যান। তার এই দেড় বছরের জীবন ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত:

  1. সেনানিবাসে আশ্রয়: ৫ আগস্টের পর প্রাণভয়ে তিনি সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। আইএসপিআর-এর প্রকাশিত তালিকা থেকেও এর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
  2. পদত্যাগ: সেনানিবাসে অবস্থানকালেই ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি স্পিকারের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
  3. নিয়মিত স্থান পরিবর্তন: পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি সেনানিবাস ছাড়েন। এরপর তিনি একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় থাকেননি। ডিবি পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নিয়মিত জায়গা বদল করতেন এবং আত্মীয়-স্বজনের বাসায় অস্থায়ীভাবে থাকতেন। সর্বশেষ তিনি ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছিলেন।

কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে? (মামলা ও অভিযোগের বিস্তারিত)

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ মোট ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

  • মূল মামলা: তাকে মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন লালবাগ থানায় দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
  • অন্যান্য অভিযোগ: এছাড়া রাজধানীর বনানী ও উত্তরা থানা এবং রংপুরেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে রংপুরে এক স্বর্ণকার নিহতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলা।
  • মামলার বর্তমান অবস্থা: প্রাপ্ত ছয়টি মামলার মধ্যে ইতোমধ্যে তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে এবং বাকি তিনটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

আদালতে কী ঘটেছিল? (রিমান্ড বাতিল ও কারাগারে প্রেরণ)

গ্রেপ্তারের দিন দুপুরে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।

  • পুলিশের পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হলেও বিচারক তা নামঞ্জুর করেন।
  • একইসাথে তার জামিন আবেদনও খারিজ করে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
  • আদালত প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও স্লোগান পাল্টা স্লোগানের সৃষ্টি হয়। ভিড়ের চাপে সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে তিনি আঘাত পান বলেও সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে।

শিরীন শারমিন চৌধুরীর রাজনৈতিক পটভূমি

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি পরিচিত নাম।

  • প্রথম নারী স্পিকার: ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা এই পদে বহাল ছিলেন।
  • সংসদ সদস্য: তিনি রংপুর-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। এর আগে ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে সংসদে আসেন এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সাধারন জিজ্ঞাসা

শিরীন শারমিন চৌধুরী কবে স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করেন?

২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন।

তাকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে?

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর লালবাগ থানায় সংঘটিত সহিংসতা ও ভাঙচুরের একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আদালত তাকে কয়দিনের রিমান্ড দিয়েছে?

আদালত পুলিশের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেছে এবং তাকে সরাসরি কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছে।

গ্রেপ্তারের আগে তিনি কোথায় ছিলেন?

তিনি দীর্ঘ দেড় বছর ধরে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন এবং সর্বশেষ ধানমন্ডিতে একজন আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন।

তথ্যসূত্র: এই আর্টিকেলের তথ্যসমূহ সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত ও যাচাইকৃত।

Leave a Comment