নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় ও ৫১৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ

দীর্ঘ ২১ বছরের আইনি লড়াই শেষে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ মামলায় কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো (Niko)-এর বিরুদ্ধে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (ICSID)-এর রায় অনুযায়ী, অবহেলাজনিত কারণে বিস্ফোরণ ঘটানোর দায়ে নাইকোকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

২০০৫ সালে টেংরাটিলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সেই বিস্ফোরণ আজও স্থানীয় মানুষের মনে দগদগে ঘা হয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার রায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। কিন্তু কী ঘটেছিল সেদিন? কেন এই বিপুল অংকের জরিমানা? আসুন, বিস্তারিত জেনে নিই।

টেংরাটিলা বিস্ফোরণ ও মামলার প্রেক্ষাপট

২০০৩ সালে ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি অনুসন্ধানের জন্য কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু অনুসন্ধান চলাকালে ২০০৫ সালে সেখানে পরপর দুটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে।

  • বিস্ফোরণের কারণ: আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, নাইকোর তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় খননকাজ চলার সময় আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড মানা হয়নি। প্রয়োজনীয় সতর্কতার অভাবেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
  • ক্ষয়ক্ষতি: বিস্ফোরণের ফলে গ্যাসক্ষেত্রের বিশাল মজুদ গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশেপাশের এলাকার স্থাপনা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

আইনি লড়াইয়ের টাইমলাইন

এই মামলার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্স বিভিন্ন সময়ে নাইকোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়।

  1. প্রাথমিক দাবি: পেট্রোবাংলা শুরুতে নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে, যা দিতে নাইকো অস্বীকৃতি জানায়।
  2. মামলার শুরু (২০০৭): নাইকো স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা করে। এর প্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলা নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়।
  3. হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট: হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়। আপিল বিভাগে গেলেও রায় বাংলাদেশের পক্ষেই থাকে।
  4. আন্তর্জাতিক আদালতে নাইকো (২০১০): ক্ষতিপূরণ এড়াতে এবং গ্যাস বিল পেতে নাইকো উল্টো ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত বা ইক্সিড (ICSID)-এ দুটি মামলা করে।
  5. বাপেক্সের মামলা (২০১৬): বাপেক্স ইক্সিডে নাইকোর বিরুদ্ধে প্রায় ১.১৭ বিলিয়ন ডলার (৯,২৫০ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণের মামলা করে।

ইক্সিড (ICSID)-এর চূড়ান্ত রায় ও জরিমানা

ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অফ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুটস’ (ICSID) তাদের চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছে, নাইকো সরাসরি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

  • ক্ষতিপূরণের অংক: ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার।
  • টাকার পরিমাণ: বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা।
  • রায়ের তাৎপর্য: এই রায় প্রমাণ করে যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চাইলেই উন্নয়নশীল দেশে কাজ করার সময় নিরাপত্তা মানদণ্ড উপেক্ষা করতে পারে না।

টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের ইতিহাস

সিলেট অঞ্চলের এই গ্যাসক্ষেত্রটির ইতিহাস বেশ পুরনো।

  • আবিষ্কার: ১৯৫৯ সালে।
  • গ্যাস স্তর: ১৯৬০ সালে কূপ খননের মাধ্যমে ১,০৯০ থেকে ১,৯৭৫ মিটারের মধ্যে ৯টি গ্যাস স্তর শনাক্ত করা হয়।
  • ব্যবহার: এখান থেকে উত্তোলিত গ্যাস ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও পেপার মিলে সরবরাহ করা হতো। প্রায় ২৬.৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলার পর পানি উঠে আসায় কূপটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

শেষকথা

টেংরাটিলার এই রায় বাংলাদেশের জন্য কেবল আর্থিক জয় নয়, বরং এটি জাতীয় সম্পদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় আইনি বিজয়। ৫১৬ কোটি টাকার এই ক্ষতিপূরণ হয়তো প্রকৃতির ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে দিতে পারবে না, তবে এটি ভবিষ্যতে যেকোনো বিদেশি কোম্পানির অবহেলা রোধে একটি শক্ত বার্তা দেবে।

Leave a Comment