বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাত বা এক্সপোর্ট সেক্টর হলো মূল চালিকাশক্তি। প্রতি বছরের মতো এবারও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী উঠে এসেছে দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে মন্দা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কিছু শিল্প গ্রুপ চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছে।
আজকের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশের সেরা ১০ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে, যারা গত অর্থবছরে বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে।
এক নজরে রপ্তানি পরিসংখ্যান
মূল তালিকায় যাওয়ার আগে চলুন দেখে নিই সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির একটি চিত্র:
- মোট রপ্তানি: প্রায় ৪৬.৫৭ বিলিয়ন ডলার।
- শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের অবদান: ১১ শতাংশ (প্রায় ৫.২৫ বিলিয়ন ডলার)।
- প্রধান খাত: তৈরি পোশাক (RMG), যা মোট রপ্তানির সিংহভাগ দখল করে আছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এবারের তালিকায় কিছু বড় পরিবর্তন এসেছে। বেক্সিমকো গ্রুপের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান শীর্ষ ১০ থেকে ছিটকে পড়েছে, অন্যদিকে স্কয়ার ও প্রাণ-আরএফএল তাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
১. ইয়াং ওয়ান কর্পোরেশন (Youngone Corporation)
তালিকায় সবার শীর্ষে অবস্থান করছে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইয়াং ওয়ান কর্পোরেশন।
- রপ্তানি আয়: ৯৭ কোটি ডলার।
- প্রবৃদ্ধি: আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩% বেশি।
- পণ্য: ৯৪% তৈরি পোশাক, বাকিটা জুতা ও ব্যাগ।
- মূল ক্রেতা: Adidas, Ralph Lauren, Lululemon-এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড।
- উল্লেখযোগ্য তথ্য: বিশ্বের ৪৮টি দেশে পণ্য পাঠায় এবং বাংলাদেশে তাদের ৭৩,০০০ এর বেশি কর্মী রয়েছে।
২. হা-মীম গ্রুপ (Ha-Meem Group)
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেশীয় মালিকানাধীন হা-মীম গ্রুপ, যার নেতৃত্বে আছেন এ কে আজাদ। মার্কিন শুল্কের চাপ থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো পারফর্ম করেছে।
- রপ্তানি আয়: ৬৫ কোটি ডলার।
- প্রবৃদ্ধি: ১১%।
- গন্তব্য: তাদের পণ্যের ৭১% ই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়।
৩. মন্ডল গ্রুপ (Mondol Group)
তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে মন্ডল গ্রুপ। দিনে গড়ে ৭ লাখ ১২ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করে তারা।
- রপ্তানি আয়: ৫৬ কোটি ডলার।
- মোট রপ্তানি: ২৬ কোটি পিস পোশাক (গত অর্থবছরে)।
৪. ডিবিএল গ্রুপ (DBL Group)
চতুর্থ স্থানে থাকা ডিবিএল গ্রুপ শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা সিরামিক ও ওষুধ শিল্পেও যুক্ত হয়েছে।
- রপ্তানি আয়: ৫২ কোটি ডলার।
- কর্মী সংখ্যা: প্রায় ৪৫,০০০।
৫. অনন্ত গ্রুপ (Ananta Group)
পঞ্চম স্থানে রয়েছে অনন্ত গ্রুপ। তাদের নতুন সিনথেটিক কাপড়ের কারখানা চালু হলে উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- রপ্তানি আয়: ৪৬ কোটি ২১ লাখ ডলার।
৬. প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ (PRAN-RFL Group)
এই তালিকায় একমাত্র ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান হলো প্রাণ-আরএফএল। কারণ তারা শুধু পোশাক নয়, বরং বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানি করে।
- রপ্তানি আয়: ৪৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
- পণ্য: খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স, ফার্নিচারসহ প্রায় ১,৫০০ ধরনের পণ্য।
- গন্তব্য: বিশ্বের ১২৮টি দেশে পণ্য রপ্তানি করে।
- প্রবৃদ্ধি: ১২%।
তালিকার বাকি সেরা ৪ প্রতিষ্ঠান
সেরা ১০ এর বাকি অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলো হলো:
| অবস্থান | প্রতিষ্ঠানের নাম | রপ্তানি আয় (ডলারে) | বিশেষ তথ্য |
| ৭ম | স্কয়ার গ্রুপ | ৪৩ কোটি ১৫ লাখ | রপ্তানি বেড়েছে ২০% |
| ৮ম | পলমল গ্রুপ | ৪০ কোটি ৭৬ লাখ | ২ বছরের পতন কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে |
| ৯ম | প্যাসিফিক জিন্স | ৪০ কোটি ৬১ লাখ | প্রধান পণ্য ডেনিম, মূল ক্রেতা Uniqlo |
| ১০ম | মাইক্রোফাইবার গ্রুপ | ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ | পণ্যের ৯৮% যায় ইউরোপে |
কারা ছিটকে পড়লো তালিকা থেকে?
২০২৩-২৪ অর্থবছরে তালিকায় থাকলেও এবার শীর্ষ ১০-এ জায়গা পায়নি দুটি বড় গ্রুপ:
- বেক্সিমকো গ্রুপ: সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন এই গ্রুপের কারখানাগুলো বর্তমানে বন্ধ থাকায় তারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
- স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ: এক সময় চতুর্থ স্থানে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি এবার শীর্ষ ১০-এর বাইরে চলে গেছে।
আমাদের মতামত
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয় ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং। তবে ইয়াং ওয়ান এবং হা-মীম গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করেছে যে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে প্রবৃদ্ধি সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে প্রাণ-আরএফএল এর মতো পণ্য বৈচিত্র্যকরণের দিকে নজর দিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
লেখকের শেষ কথা
এই আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তবে শেয়ার করতে ভুলবেন না। রপ্তানি বাণিজ্য নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করুন।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।