বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা হলো—নির্বাচন মানেই কোটি কোটি টাকার খেলা এবং বিলবোর্ড-পোস্টারের ছড়াছড়ি। তবে এই প্রথা ভেঙে এক নতুন ধারার সূচনা করতে যাচ্ছেন ঢাকা-৯ আসনের এনসিপি প্রার্থী ড. তাসনিম যারা। তার নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল দেখে অনেকেই একে নিউইয়র্কের আলোচিত মেয়র জোহরান মামদানির ‘মামদানি স্ট্র্যাটেজি’-র সাথে তুলনা করছেন।
নিচে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে ড. তাসনিম যারা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে নির্বাচনী রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছেন।
ড. তাসনিম যারার নির্বাচনী প্রচারণার মূল কৌশল
| বৈশিষ্ট্য | প্রচলিত রাজনীতি | ড. তাসনিম যারার কৌশল |
| অর্থায়ন | কালো টাকা বা বড় ব্যবসায়ীদের ফান্ড | সাধারণ মানুষের ক্রাউড ফান্ডিং |
| প্রচারণা | বিশাল বিলবোর্ড ও চটকদার পোস্টার | সরাসরি ভোটারদের সাথে কথা বলা |
| কর্মী বাহিনী | অর্থের বিনিময়ে দলীয় কর্মী | স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টিয়ার |
| লক্ষ্য | পেশ পেশি শক্তি প্রদর্শন | জনগণের সম্মিলিত শক্তি প্রদর্শন |
মামদানি স্ট্র্যাটেজি কী এবং এটি কেন আলোচিত?
জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম দক্ষিণ এশীয় কমিউনিস্ট ও অভিবাসী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। তার বিজয়ের মূলে ছিল ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ স্ট্র্যাটেজি। তিনি বড় কর্পোরেশন বা বিলিয়নিয়ারদের থেকে টাকা না নিয়ে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১০-২০ ডলার করে অনুদান নিয়ে নির্বাচনী খরচ যুগিয়েছিলেন।
তার প্রচারণার মূল শক্তি ছিল ভলান্টিয়াররা। তিনি মনে করতেন, “একটি বড় বিলবোর্ডের চেয়ে একজন ভোটারের সাথে ভলান্টিয়ারের ৫ মিনিটের সরাসরি আলাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।
বাংলাদেশে ড. তাসনিম যারার ক্রাউড ফান্ডিং বিপ্লব
ড. তাসনিম যারা জোহরান মামদানির সেই পথ অনুসরণ করেই তার নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহ শুরু করেন। তার নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮০ টাকা।
- বিস্ময়কর সাড়া: ফেসবুকে ফান্ড সংগ্রহের আবেদন জানানোর মাত্র ২৯ ঘণ্টার মধ্যে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যায়।
- স্বল্প মূল্যের অনুদান: মজার বিষয় হলো, এই ফান্ডের সিংহভাগ এসেছে সাধারণ মানুষের ২০, ৫০, ১০০ বা ৫০০ টাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান থেকে।
- স্বচ্ছতা: লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার সাথে সাথেই তিনি অনুদান গ্রহণ বন্ধ করে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
বিলবোর্ড নয়, গুরুত্ব পাচ্ছেন ভোটাররা
ড. তাসনিম যারা মনে করেন, কোটি কোটি কালো টাকার সামনে জনগণের সম্মিলিত শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই তিনি শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে যত্রতত্র বিলবোর্ড বা পোস্টার লাগানোর চেয়ে ভোটারদের সাথে সরাসরি কথা বলাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর জন্য তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করছেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পোলিং এজেন্ট খুঁজছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. ড. তাসনিম যারা কোন আসনের প্রার্থী?
তিনি ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনের এনসিপি (NCP) প্রার্থী।
২. ক্রাউড ফান্ডিং বলতে কী বোঝায়?
যখন কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বড় কোনো উৎস থেকে টাকা না নিয়ে সাধারণ অনেক মানুষের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাকে ক্রাউড ফান্ডিং বলে।
৩. মামদানি স্ট্র্যাটেজি বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি যেভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অনুদান এবং স্বেচ্ছাসেবকদের পরিশ্রমে নির্বাচন জয় করেছিলেন, সেই কৌশলকেই এখানে ‘মামদানি স্ট্র্যাটেজি’ বলা হচ্ছে।
আমাদের বিশ্লেষণ
ড. তাসনিম যারার এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সুস্থ ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সাধারণ মানুষ কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী খরচ বহন করে, তবে সেই প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পর বড় ব্যবসায়ীদের কাছে নয় বরং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ার প্রথম ধাপ হতে পারে।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।