যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো যৌথ ঘোষণা বা যুদ্ধবিরতি ছাড়াই ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের ১০ দফা দাবি, হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ, এবং পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অসম্মতি এই ব্যর্থতার মূল কারণ। অন্যদিকে, ইরানও তাদের পারমাণবিক গবেষণা এবং হরমুজ প্রণালীতে আধিপত্যের দাবি থেকে সরে আসতে নারাজ।
আপনি কি ভাবছেন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের কি এখানেই অবসান ঘটবে? নাকি আমরা আরও বড় কোনো বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
সম্প্রতি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকটি সারা বিশ্বের নজর কেড়েছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, ৩৯-৪০ দিনের এই দীর্ঘ ধ্বংসযজ্ঞের পর হয়তো একটি চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। উল্টো, আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীরবতা এবং ইরানের কঠোর অবস্থান পুরো বিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
চলুন, পর্দার পেছনের ভূ-রাজনীতির আসল সত্যটা উন্মোচন করা যাক।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ইসলামাবাদ বৈঠক: কেন কোনো সমাধান এলো না?
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি।
বৈঠক শেষে কোনো চুক্তি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, “তেহরান আমাদের সর্বোত্তম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।” কিন্তু কেন এই প্রত্যাখ্যান? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ও উর্দু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং গবেষক ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর পেছনে রয়েছে মূলত তিনটি বড় কারণ:
১. হরমুজ প্রণালীতে একচ্ছত্র অধিকার:
ইরান চায় হরমুজ প্রণালীতে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকুক। আন্তর্জাতিক জলসীমা নির্ধারণের নিয়ম অনুযায়ী, এখানকার কোনো অংশই আন্তর্জাতিক সীমানার আওতায় পড়ে না, পুরো অংশটিই ইরানের। ইরান এখন এখানে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে টোল বসাতে চায়, তাও আবার নিজেদের মুদ্রা ‘রিয়াল’-এ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক পরাজয়, যা তারা মেনে নিতে নারাজ।
২. আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলার ফেরত:
কাতারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। ইরান তাদের ১০ দফা দাবির মধ্যে এই অর্থ বিনা শর্তে ফেরত চেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ইরানের হাতে তুলে দিয়ে তাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে চায় না।
৩. পারমাণবিক গবেষণা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না দেওয়া। তারা দাবি জানিয়েছে, ইরানের কাছে থাকা ৪৮০ কিলোগ্রাম ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য দেশে স্থানান্তর করতে হবে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পারমাণবিক চুল্লি ও গবেষণা তাদের নিজস্ব অধিকার এবং এটি কোনোভাবেই বন্ধ করা হবে না।
ট্রাম্পের হুংকার বনাম নীরবতা: এর অর্থ কী?
বৈঠকের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় হুমকি দিয়েছিলেন, “পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, আর কখনোই ফিরে আসবে না।” তিনি তার ‘ডুমসডে প্লেন’ (Doomsday Plane) আকাশে উড়িয়ে পারমাণবিক হামলার ভয় দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু এরপরেও ইরান কোনো ভয় পায়নি। বরং তেহরানের রাস্তায় কোটি কোটি মানুষ নেমে আসে। গবেষক আরিফ বিল্লাহ একে ট্রাম্পের “শেষ হুংকার” বা “শেষ গর্জন” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন চাইছে যতটা সম্ভব নেগোসিয়েশন করে তাদের ক্ষতি কমাতে, কারণ সরাসরি যুদ্ধে তারা এরই মধ্যে সামরিক ও আর্থিকভাবে বেশ চাপের মুখে পড়েছে।
ইসরাইলের ভূমিকা: লেবাননে আক্রমণ কি শুধুই চাপ প্রয়োগ?
আলোচনা চলাকালীন সময়েই ইসরাইল লেবাননে আক্রমণ চালায়। এটি কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়।
- কৌশলগত চাপ: লেবাননে এই আক্রমণ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতেই হয়েছে। আলোচনার টেবিলে নিজেদের পাল্লা ভারী করতে এবং ইরানের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে এই ফ্রন্ট খুলে দেওয়া হয়েছিল।
- লক্ষ্য পূরণ হয়নি: যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, ইসরাইলকে দিয়ে এই ধরনের চাপ প্রয়োগ করলে ইরান হয়তো নমনীয় হবে। কিন্তু ইরান তাদের অবস্থান থেকে এক চুলও সরে আসেনি।
বিশ্বনেতাদের অবস্থান: ইউরোপ কেন আমেরিকার পাশ থেকে সরে গেল?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবত এই প্রথম কোনো বড় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মহলের প্রায় শূন্য সমর্থন পাচ্ছে।
- ন্যাটো পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের সাথে যুদ্ধ করা ন্যাটোর দায়িত্ব নয়।
- স্পেন, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানির মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
- এমনকি উপসাগরীয় দেশ কাতার সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের মাটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
ফ্রান্স, রাশিয়া এবং চীনের মতো পরাশক্তিগুলোও হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার পশ্চিমা প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যে ফাটল ধরেছে।
শেষকথা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই দ্বন্দ্ব শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক মেরুকরণের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মরীয়া চেষ্টা, অন্যদিকে ইরানের মাথা নত না করার অদম্য জেদ। ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হলেও, এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণে এখন আর পশ্চিমা দেশগুলো একক নিয়ন্ত্রক নয়।
এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে বিজয়ী হবে? যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের আগের সেই একক আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি ইরানের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো বলয় তৈরি হবে?
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো বার্তা কক্ষের বিশেষ টকশো, ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর বিশ্লেষণ এবং আল জাজিরার আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিষয়ক রিপোর্ট।
“I’m Md Parvez Hossen, a professional blogger and SEO expert living in the USA. As the driving force behind BDTopNews.Com, I’m dedicated to delivering highly relevant, accurate, and authoritative content. My goal is to ensure readers always find the reliable information they need.