বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম সিটি ব্যাংক। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষা করে বিলাসী ভবন নির্মাণ ও অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সুদ আয় কমে যাওয়া সত্ত্বেও বিশাল অঙ্কের জমিতে বিনিয়োগ এবং নির্বাহীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মনে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন।
এই আর্টিকেলে আমরা জানব, কেন সিটি ব্যাংকের এই নতুন প্রজেক্টকে ‘অপচয়’ বলা হচ্ছে এবং একজন গ্রাহক হিসেবে এটি আপনার জন্য কতটা ভয়ের কারণ হতে পারে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের সুদ আয় গত বছরের তুলনায় ১৩৪ কোটি টাকা কমেছে। অথচ এই আর্থিক মন্দার সময়েও ব্যাংকটি গুলশানে মাত্র ২০ কাঠা জমির জন্য ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা চড়া দামে কেনা বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে নির্বাহীদের বেতন ও ফি প্রায় ২২,৯১,৬৪৯ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রাহকের স্বার্থ বিকিয়ে বিলাসী ভবন: মূল অভিযোগ কী?
একটি ব্যাংকের মূল চালিকাশক্তি হলো তার গ্রাহকের আমানত। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সিটি ব্যাংক গ্রাহকের স্বার্থের চেয়ে জৌলুসপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে বেশি মনোযোগী।
১. চড়া দামে জমি ক্রয় ও দুর্নীতির শঙ্কা
গুলশান এলাকায় সিটি ব্যাংক তাদের নতুন প্রধান কার্যালয় বা ভবনের জন্য ২০ কাঠা জমি কিনেছে। অবাক করা বিষয় হলো, এই জমির জন্য ব্যয় করা হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা।
- বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জমির এই দাম স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
- চড়া দামে এই জমি কেনার পেছনে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগ দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
২. আয়ের নিম্নগতি বনাম ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি
যেকোনো ব্যবসায় আয় কমলে ব্যয় কমানোর নীতি অবলম্বন করা হয়। কিন্তু সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটি:
- ব্যাংকের মূল আয়ের উৎস অর্থাৎ সুদ আয় (Interest Income) কমেছে ১৩৪ কোটি টাকা।
- অথচ এই লোকসানের সময়েই নেওয়া হয়েছে বিলাসী ভবন নির্মাণের প্রজেক্ট।
নির্বাহী কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি: যৌক্তিক না কি অনৈতিক?
সাধারণত ব্যাংকের পারফর্মেন্স খারাপ হলে তার প্রভাব কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধায় পড়ার কথা। কিন্তু সিটি ব্যাংকে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ব্যাংকের সুদ আয় কমলেও নির্বাহী কর্মকর্তাদের (Executive Officers) বেতন ও ফি বৃদ্ধি পেয়েছে ২২,৯১,৬৪৯ টাকা।
এতে প্রশ্ন জাগে, ব্যাংকের পারফর্মেন্স যখন নিম্নমুখী, তখন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই বাড়তি সুবিধা কি গ্রাহকের আমানতের টাকায় দেওয়া হচ্ছে না?
এক নজরে সিটি ব্যাংকের আর্থিক অসঙ্গতি (২০২৬)
পাঠকদের সুবিধার্থে তথ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| খাতের নাম | টাকার পরিমাণ/বিবরণ | মন্তব্য |
| জমির পরিমাণ | ২০ কাঠা | গুলশান এলাকা |
| জমির ক্রয়মূল্য | ৩৪৫ কোটি টাকা | অত্যধিক চড়া দাম |
| সুদ আয় হ্রাস | (-) ১৩৪ কোটি টাকা | ব্যাংকের আয়ে ধস |
| নির্বাহীদের বেতন বৃদ্ধি | (+) ২২,৯১,৬৪৯ টাকা | আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ |
গ্রাহকদের জন্য এটি কেন চিন্তার বিষয়?
একজন সাধারণ গ্রাহক হিসেবে আপনি ভাবতে পারেন, ব্যাংক ভবন বানালে আমার সমস্যা কী? সমস্যাটি মূলত ‘কস্ট অফ ফান্ড’ বা তহবিল ব্যবস্থাপনায়।
- সার্ভিস চার্জ বৃদ্ধি: ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বা অপচয় বাড়লে, সেই ঘাটতি পোষাতে ব্যাংকগুলো প্রায়ই গ্রাহকদের ওপর বাড়তি সার্ভিস চার্জ বা হিডেন চার্জ আরোপ করে।
- আমানতের সুদের হার হ্রাস: ব্যাংকের আয় (Interest Income) কমে গেলে তারা আমানতকারীদের (DPS/FDR) কম মুনাফা দিতে বাধ্য হয়। ১৩৪ কোটি টাকা আয় কমা আপনার লভ্যাংশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
- তারল্য সংকট: বিলাসী প্রকল্পে বিশাল অঙ্কের টাকা আটকে গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট দেখা দিতে পারে।
শেষকথা
সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের উচিত গ্রাহকের আমানতের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। সুদ আয় কমে যাওয়া এবং নির্বাহী ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এই অসঙ্গতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। গ্রাহকের স্বার্থ বিকিয়ে কেবল বিলাসী ভবন নির্মাণ নয়, বরং টেকসই ব্যাংকিং সেবাই এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: জাতীয় দৈনিক গণমাধ্যম।
আমি একজন জার্নালিস্ট। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতক পাশ করেছি। বর্তমানে জাতীয় পত্রিকায় ফুল টাইম কাজ করছি। পাশাপাশি আমার নিজের নিউজ পোর্টাল BDTOPNEWS এ সময় দেই।