জামায়াত-শিবিরের ‘অদৃশ্য’ শক্তি: রাজনীতি, অর্থনীতি ও নেটওয়ার্ক তৈরির নেপথ্য কৌশল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৭১ সালের ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পরেও দলটি কীভাবে টিকে আছে তা অনেকের কাছেই এক বিস্ময়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে যে, দলটির শিকড় অনেক গভীরে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক চাপ ও আইনি বাধার মুখেও কীভাবে জামায়াত-শিবির তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাদের ‘কৌশলী অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক’ এবং ‘মিশনরি স্টাইলে’ গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে।

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করব জামায়াত-শিবিরের সেই বিশাল সাম্রাজ্যের খুঁটিনাটি, যা দলটিকে রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যেও অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।

জামায়াতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্রাজ্য

দ্রুত তথ্য জানার জন্য নিচের তালিকাটি দেখুন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোই জামায়াতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে:

খাত (Sector)প্রতিষ্ঠানের নাম (উদাহরণ)
স্বাস্থ্যসেবাইবনে সিনা ট্রাস্ট (হাসপাতাল, ফার্মা, ডায়াগনস্টিক)
ব্যাংকিং ও অর্থইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক (প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পৃক্ততা)
শিক্ষা (বিশ্ববিদ্যালয়)মানারাত ইন্টারন্যাশনাল, IIUC (চট্টগ্রাম), নর্দান ইউনিভার্সিটি
কোচিং সেন্টাররেটিনা (মেডিকেল), ফোকাস (বিশ্ববিদ্যালয়), কনক্রিট (ইঞ্জিনিয়ারিং)
মিডিয়াদৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম, দিগন্ত টিভি
ব্যবসা ও পর্যটনকেয়ারি গ্রুপ (আবাসন ও পর্যটন জাহাজ)

রাজনীতি থেকে অর্থনীতি

স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামী যখন পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসে, তখন তারা শুধু ভোটের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা খ্রিস্টান মিশনারিদের আদলে ‘দাতব্য ও সেবাধর্মী’ প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে নজর দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত বুঝতে পেরেছিল যে রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলেও টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন। এই দর্শনের প্রধান রূপকার ছিলেন মীর কাসেম আলী, যিনি ১৯৮০ সালে ‘ইবনে সিনা ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।

স্বাস্থ্যখাত

জামায়াতের আয়ের এবং জনসম্পৃক্ততার অন্যতম বড় উৎস হলো স্বাস্থ্যখাত।

  • ইবনে সিনা ট্রাস্ট: এটি কেবল একটি হাসপাতাল নয়, বরং মেডিকেল কলেজ, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক বিশাল চেইন।
  • জনপ্রিয়তার কৌশল: সব ধরনের টেস্টে ২৫% বা তার বেশি ছাড় দেওয়ার কৌশল ইবনে সিনাকে মধ্যবিত্তের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জনের পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।

ব্যাংকিং ও করপোরেট জগৎ

১৯৮৩ সালে শরিয়াহভিত্তিক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জামায়াত দেশের অর্থনীতির মূলধারায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বিভিন্ন ইনস্যুরেন্স কোম্পানি এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা হাজার কোটি টাকার একটি প্রবাহ তৈরি করে।

এছাড়া আবাসন ও পর্যটন খাতেও তাদের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:

  • কেয়ারি গ্রুপ: রিয়েল এস্টেট ব্যবসা।
  • পর্যটন: সেন্টমার্টিন রুটের জনপ্রিয় জাহাজ ‘কেয়ারি সিন্দাবাদ’ মূলত তাদের মালিকানাধীন।

শিক্ষা ও ছাত্রশিবির

জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সবচেয়ে সফল অংশ হলো শিক্ষাখাত। তারা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং ছাত্র সংগ্রহের জন্য কোচিং সেন্টারগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।

  • বিশ্ববিদ্যালয়: মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (IIUC), বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ইত্যাদি।
  • কোচিং সাম্রাজ্য: মেডিকেল ভর্তির জন্য ‘রেটিনা’, ভার্সিটি ভর্তির জন্য ‘ফোকাস’ এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ‘কনক্রিট’ বা ‘কনসেপ্ট’লক্ষ্য করুন: এই কোচিং সেন্টারগুলো থেকে অর্জিত অর্থ এবং মেধাবী ছাত্রদের রিক্রুটমেন্ট ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

মিডিয়া ও প্রচারযন্ত্র

নিজেদের মতাদর্শ প্রচার এবং রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতে জামায়াত গড়ে তুলেছে নিজস্ব মিডিয়া হাউজ। দৈনিক নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম এবং এক সময়ের জনপ্রিয় দিগন্ত টেলিভিশন তাদের প্রচারণার মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: রেটিনা কোচিং সেন্টার কি জামায়াত বা শিবিরের পরিচালিত?

উত্তর: বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে, রেটিনা (মেডিকেল), ফোকাস (বিশ্ববিদ্যালয়) এবং কনক্রিট কোচিং সেন্টারগুলো মূলত ছাত্রশিবিরের তত্ত্বাবধানে ও জামায়াতের নীতিতে পরিচালিত হয়।

প্রশ্ন: ইবনে সিনা হাসপাতালের মালিক কে বা কারা?

উত্তর: ইবনে সিনা ট্রাস্ট ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। এটি একটি ট্রাস্ট হলেও এর পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘকাল জামায়াতপন্থীদের প্রভাব ছিল।

প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামীর আয়ের উৎস কী?

উত্তর: জামায়াতের আয়ের মূল উৎস হলো তাদের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল (ইবনে সিনা), ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, কোচিং সেন্টার, এনজিও, এবং প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা ডোনেশন।

শেষ কথা

বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করা হলেও তাদের ‘অর্থনৈতিক জাল’ (Economic Web) ভাঙা সম্ভব হয়নি। ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও—সব মিলিয়ে তারা এমন একটি ‘প্যারালাল ইকোনমি’ বা সমান্তরাল অর্থনীতি তৈরি করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ও অক্সিজেন জুগিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থেকেও কীভাবে একটি দল নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলতে পারে, তার এক বড় উদাহরণ এই নেটওয়ার্ক।

(সতর্কবার্তা: এই আর্টিকেলটি সাম্প্রতিক মিডিয়া রিপোর্ট এবং ভিডিও বিশ্লেষণের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনশীল।)

Leave a Comment